পান্থকুঞ্জ পার্ক ও ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় অতিথি ও আয়োজকেরা। বাংলামোটর, ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৬
পান্থকুঞ্জ পার্ক ও ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় অতিথি ও আয়োজকেরা। বাংলামোটর, ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৬

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জের পরিবেশ বিপন্ন করবে এক্সপ্রেসওয়ের নতুন র‍্যাম্প

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি-পলাশী সংযোগ সড়কের র‍্যাম্পের কারণে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে কাঁঠালবাগান, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, পলাশী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) এলাকার পরিবেশ ও যান চলাচলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় পরিবেশ ও নগর–পরিকল্পনাবিদেরা এই শঙ্কার কথা জানান।

যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন, ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল চেঞ্জ, বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন, বিআইপি ও দুনিয়াদারি আর্কাইভ।

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, কোনো শহরের উন্নয়ন যদি শুধু মানুষের সুবিধার জন্য করা হয়, প্রকৃতপক্ষে সেটা উন্নয়ন হয় না। কারণ, প্রকৃতি ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাই উন্নয়নের প্রভাবে পরিবেশের কী ক্ষতি হচ্ছে, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্মের দুই সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব ও নাঈম উল হাসান। তাঁরা বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পান্থকুঞ্জ পার্কের আশপাশে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করার কথা নয়। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই আইনের তোয়াক্কা করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও এই কাজ বন্ধ করেনি। এখন বিএনপি সরকারও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এক প্রকল্পের জন্য পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিল এলাকার যত গাছ কাটা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে ঢাকায় আর মানুষ বসবাস করতে পারবে না।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পান্থকুঞ্জ পার্ক অংশের র‍্যাম্প বাতিলের দাবি জানান নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, এই র‍্যাম্প নির্মাণ হলে পান্থকুঞ্জ পার্ক, হাতিরঝিল জলাধার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও যান চলাচল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর সুবিধা মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরাই পাবেন।

র‍্যাম্প বাতিলের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর সাড়া কেন পাওয়া যায়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এই নগর–পরিকল্পনাবিদ। তিনি বলেন, জনগণের কথা শুনে র‍্যাম্পটি বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে আগের সরকারের সময়ে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, সেটিরও তদন্ত করতে হবে।

কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা সাদমান সাকিব বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ কাঁঠালবাগান এলাকায় ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে আশ্রয়ের কোনো খোলা জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই। একমাত্র ভরসা ‘পান্থকুঞ্জ পার্ক’, যা এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও অপরিকল্পিত প্রকল্পের কারণে বেদখল হতে বসেছে। এই এলাকার সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে। তিনি মানুষের কথা ভেবে এই কর্মযজ্ঞ নিয়ে পুনরায় ভাবার কথা বলেন।

পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার অভাবে ঢাকা শহর ভয়াবহ জনদুর্ভোগের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। সম্প্রতি পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হলেও কোনো সমাধান মেলেনি। ঢাকার পার্ক ও জলাভূমি রক্ষার জন্য ‘পার্ক অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অথরিটি’ নামে একটি আলাদা সংস্থা গঠনের কথা বলেন তিনি।

বিআইপির সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, যেই রাজউক বা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শুরুতে গেছে, সেই রাজউক বা সিটি করপোরেশনকে একই অবস্থায় রেখে বিএনপি সরকার পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেই প্রশ্ন আমাদের এখন তোলার সময় এসেছে।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন বুয়েটের তড়িৎ ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান, লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রদর্শনী বেঙ্গল স্ট্রিমের প্রধান কিউরেটর নিক্লাওস গ্রেবার, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আবদুল্লাহ প্রমুখ।