ঢাকা মহানগরের স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কার বিতরণ শুরু করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আজ শুক্রবার দুই দিনব্যাপী এ কর্মসূচি শুরু হয়। গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় আজকের অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল আটটায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।
উদ্বোধনী পর্বের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। তিনি বলেন, ‘আজকের শিশু-কিশোরদের উচ্ছল হাসিমুখ দেখে আমি অত্যন্ত অভিভূত ও আবেগাপ্লুত।’
শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশে বইয়ের ভূখণ্ড উন্মোচনের ওপর জোর দিয়ে ইয়াসমিন বেগম আরও বলেন, ‘বর্তমানে পড়াশোনার তীব্র মানসিক চাপ ও প্রতিযোগিতার পরও তোমরা যে নিজেদের বই পড়ার সঙ্গে যুক্ত রাখতে পেরেছ, এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের মনোজগৎ উন্মোচিত ও প্রসারিত হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের চিন্তাচেতনাকে নিয়ে যেতে হলে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। অভিভাবক ও স্বজনদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা প্রতিটি শিশুর হাতে উপহার হিসেবে অন্তত একটি করে বই তুলে দিন, যাতে তারা বই পাশে রেখে কিংবা বইয়ের সান্নিধ্যে থেকে ঘুমাতে যেতে পারে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার। তিনি বই ও লাইব্রেরির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘বইয়ের ভেতরে যা লেখা থাকে, তা কিন্তু মানুষের সুন্দর চিন্তা ও কথারই লিখিত রূপ। যাঁরা সুন্দর করে চিন্তা করতে ও কথা বলতে পারেন, তাঁরা সুন্দর লিখতে পারেন। আর যাঁরা সুন্দর লেখেন, তাঁদের লেখা পাঠ করেই আমরা কথা বলি।’
আব্দুন নূর তুষার পাঠ্যবই ও পাঠ্যক্রমের বাইরের বইয়ের মাঝের প্রাচীর ভাঙার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর যত বিখ্যাত রাজা-বাদশাহ, মহান শাসক বা গুণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই একটি করে নিজস্ব লাইব্রেরি ছিল। বই ও লাইব্রেরির সান্নিধ্যে না এলে কখনোই সত্যিকারের বড় মানুষ হওয়া যায় না। পাঠ্যবই আর বাইরের বইয়ের মাঝে যে কৃত্রিম দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। বই মাত্রই পড়ার উপযোগী। শুধু জিপিএ বা নম্বরের জন্য নয়, জ্ঞান অর্জন ও মানুষ হওয়ার জন্যই আমাদের বই পড়তে হবে।’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন গ্রামীণফোনের চিফ টেকনোলজি অফিসার (সিটিও) আবুল কাশেম মহিউদ্দিন আল-আমিন। তিনি বলেন, ‘স্কুল-কলেজের নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বিশাল এক পৃথিবী ছড়িয়ে আছে, যা আমাদের জানতে হবে। আলোকিত মানুষ গড়ার এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে আমরা গর্বিত।’
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৪৮ বছর ধরে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইপড়া ও নানা উৎকর্ষ কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১ হাজার ৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২ লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। দেশের পাঁচটি মহানগরে আয়োজিত উৎসবের ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকা মহানগরের ৭১টি স্কুলের ৫ হাজার ৮২৩ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে দুই দিনব্যাপী উৎসবে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট আটটি পর্বে তাদের হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেওয়া হবে।
প্রতিটি স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘শুভেচ্ছা’, ‘অভিনন্দন’ ও ‘সেরা পাঠক’—এই তিনটি বিভাগে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এ বছর ঢাকার উৎসবে ৪ হাজার ২৮৮ জন ‘শুভেচ্ছা’, ১ হাজার ৩৬৭ জন ‘অভিনন্দন’ এবং ১৬৮ জন ‘সেরা পাঠক’ পুরস্কার পাচ্ছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ হাজার ১৮ জন ছেলে ও ৪ হাজার ৮০৫ জন মেয়ে।
এবারের উৎসবে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অনলাইন সেফটি ফান্ডামেন্টালস’ শীর্ষক সচেতনতামূলক অনলাইন কোর্স চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোর ও অভিভাবকেরা নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের মৌলিক বিষয়গুলো জানতে পারবেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলের ‘অনলাইন সেফটি কর্নার’-এ অভিভাবক ও শিক্ষকদের শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ বিষয়ে সচেতনতামূলক তথ্য দেওয়া হচ্ছে।