চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪ এপ্রিল
চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪ এপ্রিল

উৎসবমুখর আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষ উদ্‌যাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবার উদ্‌যাপিত হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। উৎসবমুখর পরিবেশে ক্যাম্পাসে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীরা নববর্ষকে স্বাগত জানান। সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে সাজানো ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলা, সংগীত, নৃত্য, কবিতা, বায়োস্কোপ প্রদর্শনী এবং বৈশাখী শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়। পয়লা বৈশাখের এ আনন্দঘন পরিবেশে যোগ দেন সব শ্রেণি–পেশার মানুষ।

নববর্ষ বরণে সকাল থেকে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম। পান্তা-ইলিশের আয়োজন দিয়ে শুরু হওয়া বর্ষবরণ যথাক্রমে শোভাযাত্রা, মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

বৈশাখী শোভাযাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নববর্ষ বরণে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৬ মিনিটে চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য, প্রক্টর ও শিক্ষকেরা।

শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ঘুরে যায়। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলা অনুষদে এসে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে শেষ হয়।

এবারের শোভাযাত্রায় মোট পাঁচটি প্রধান প্রতীক বা মোটিফ রাখা হয়। এগুলো হলো মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া।

পুতুলনাচ, নাগরদোলাসহ নানা আয়োজনে বৈশাখ বরণ উৎসব করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪ এপ্রিল

পুতুলনাচ-নাগরদোলায় ছাত্রদলের বৈশাখ বরণ

বাংলার গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির উপাদান পুতুলনাচ, নাগরদোলা, লাঠিখেলাসহ নানা আয়োজনে বৈশাখ বরণ উৎসব করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। পরে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হয়।

এরপর শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী নড়াইলের লাঠিখেলা। ঢোলের তালে তালে লাঠি হাতে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে পরাস্ত করার নৃত্য দেখতে মুহূর্তেই আশপাশের মানুষ ভিড় করেন।

মল চত্বরের পানির ফোয়ারার পাশেই বসানো হয় হালখাতার ঘর। সেখানে পুরোনো আমলের হারিকেনসহ নানা উপাদান দিয়ে ঘরটি সাজানো হয়। পাশেই টেবিল দিয়ে হালখাতা নিয়ে বসেন ছাত্রদলের নেতারা।

ছাত্রদলের আয়োজনের অংশ হিসেবে হাকিম চত্বরে বসানো হয় নাগরদোলা। সকাল থেকেই এই নাগরদোলায় চড়তে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনুষ্ঠানে বাউলগান, সারিগানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানটি বেলা তিনটার দিকে উদ্বোধন ঘোষণা করেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস। সঞ্চালনা করেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক। এ ছাড়া মঞ্চে সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন শাওন উপস্থিত ছিলেন।

যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতায় নববর্ষ উদ্‌যাপন করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট ও কোরাস

যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতায় নববর্ষ উদ্‌যাপন

‎সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট ও কোরাসের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতায় বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন করা হয়।

এতে গান পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তি করেন কবি মোহন রায়হান, দীপক সুমন, কবি সোয়েব মাহমুদ, মাভৈ গানের দল, হুমায়ূন আজম রেওয়াজ, ওয়ারদা আশরাফ, গৌরব ভৌমিক, শিহাব উদ্দিন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে ইরান-ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। গান-কবিতার আয়োজনের শেষে গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়।

ঐতিহাসিক বটতলায় উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদ্‌যাপন করে জাতীয় ছাত্র শক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪ এপ্রিল

ঐতিহাসিক বটতলায় জাতীয় ছাত্র শক্তির নববর্ষ উদ্‌যাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদ্‌যাপন করে জাতীয় ছাত্র শক্তি। নববর্ষ উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে মেলা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে সংগঠনটি। এতে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জাতীয় ছাত্র শক্তির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

নববর্ষে ডাকসুর বায়োস্কোপ প্রদর্শনী

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কর্তৃক বায়স্কোপে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসসংবলিত বিভিন্ন ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার ডাকসু ভবনের সামনে সকাল থেকে বায়োস্কোপে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি প্রদর্শন করা হয়।

নববর্ষকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তবে বিকেল থেকে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার উদ্দেশ্যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আসেন দর্শনার্থীরা।

উত্তরা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে বৈশাখী মেলা উপভোগ করতে আসেন সিনথিয়া জাহান নামের এক তরুণী। ঢাকা শহরের জনবসতিপূর্ণ জায়গায় এত সুন্দর বৈশাখী মেলার আয়োজন দেখে তিনি আনন্দিত। নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত মেলা দেখে ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে এবারই প্রথম ঢাকায় নববর্ষ উদ্‌যাপন করেছেন বলেও জানান এই তরুণী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে কথা হয় আবদুল জলিল নামের এক রিকশাচালকের সঙ্গে, যিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেলা দেখতে এসেছেন। ছয় বছর বয়সী মেয়ে রাইসা ইসলামের বায়না রাখতেই সবাইকে নিয়ে মেলায় এসেছেন বলে জানান তিনি।