
অবৈধ দখলে খালের প্রায় ২০০ মিটার জায়গা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। খাল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছিল ট্রাক টার্মিনাল। এর আশপাশে গড়ে ওঠে গাড়ির যন্ত্রাংশ মেরামত, গাড়ির জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকান। এসব দোকান থেকে এবং ট্রাক পার্কিং থেকে মাসে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করতেন ট্রাকচালক ইউনিয়নের নেতারা।
পরে অবৈধ ওই ট্রাক টার্মিনাল উচ্ছেদ করে সেখানে খাল খনন করা হয়। খননকৃত খালের দুপাশে লাগানো হয় বিভিন্ন গাছের চারা। এক বছরের বেশি সময় পর আজ শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই চারা গাছগুলো বেশ বড় হয়েছে। অবৈধ ট্রাক টার্মিনালের রুক্ষ জায়গাটিতে এখন দেখা মিলছে একখণ্ড সবুজের।
এই দৃশ্য রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলার লাউতলা খালের। প্রায় ১ বছর ৯ মাস আগে (গত বছরের জানুয়ারিতে) লাউতলা খালে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ট্রাক টার্মিনাল অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। উদ্ধারকৃত জায়গা যাতে পুনরায় বেদখল না হয়, সে জন্য অভিযানের পরই সেখানে খাল খনন করে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। এর প্রায় সাত মাস পর ওই বছরের আগস্টেই সেখানে প্রায় ২ হাজার বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে সংস্থাটি।
এখন জায়গাটি এত সবুজ হয়েছে যে তাকাতেই ভালো লাগে। ওই দিক থেকে আসা বাতাসও ঠান্ডা। অথচ আগে সারাক্ষণ শুধু যন্ত্রের আওয়াজ, ধোঁয়া, পোড়া মবিল ও তেলের গন্ধ নাকে আসত।রিয়াজুল ইসলাম, স্থানীয় বাসিন্দা
এখন দিনের বেলা এলাকাবাসীর অনেকেই ওই লাউতলা খালের পাড়ে গাছের ছায়ায় গিয়ে প্রকৃতির স্বাদ নেন। সন্তানদের নিয়ে কেউ কেউ সকাল-বিকেল সময় করে হাঁটাহাঁটি করেন, ঘুরে বেড়ান। স্থানীয় কিশোর-যুবকেরাও ওই জায়গায় গিয়ে গল্প-আড্ডায় সময় কাটান।
খালের পাশেই একটি তিনতলা ভবনের দোতলায় ভাড়া থাকেন রিয়াজুল ইসলাম। ওই জায়গায় যখন অবৈধ ট্রাক টার্মিনালটি ছিল, তখনো তিনি ওই বাসাতেই ভাড়া থাকতেন। রিয়াজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এখন জায়গাটি এত সবুজ হয়েছে যে তাকাতেই ভালো লাগে। ওই দিক থেকে আসা বাতাসও ঠান্ডা। অথচ আগে জায়গাটিতে ট্রাক রাখা হতো। সারাক্ষণ শুধু যন্ত্রের আওয়াজ, ধোঁয়া, পোড়া মবিল ও তেলের গন্ধ নাকে আসত।
তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সন্ধ্যা হলেই গাছপালায় ঢাকা ওই খাল পাড়ের পরিবেশটা অন্য রকম হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতে ওই জায়গায় সিটি করপোরেশন কিংবা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কোনো নজরদারি থাকে না। সিটি করপোরেশনের বসানো বাতিগুলোও প্রায়ই বন্ধ থাকে। এই সুযোগে অন্ধকারে অনেকেই সেখানে মাদক সেবন করেন।
লাউতলা এলাকার বাসিন্দা ইয়াসির আলী বলেন, আগে রাতেও অনেকে খালের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করতেন। পরে কয়েকবার সেখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এরপর সিটি করপোরেশন থেকে খালের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবেশের জায়গাটি লোহার গ্রিলের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেয়। তবে এখন দিনের বেলা অনেকেই উত্তর পাশ দিয়ে ওই জায়গায় ঢুকে ঘোরাফেরা করেন।
এর আগে ২০২১ সালের ১৩ আগস্ট লাউতলা খালের দখল নিয়ে ‘খালে টার্মিনাল, মাসে আসে ৭ লাখ টাকা’ শিরোনামে প্রথম আলোর শেষের পাতায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল।
উচ্ছেদের পর ঢাকা উত্তর সিটির পক্ষ থেকে ওই খালকে কেন্দ্র করে সেখানে একটি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, পার্কের নির্মাণকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত সেখানে পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, পার্কের এক পাশে শিশুদের জন্য আলাদা একটি জায়গা রাখা হবে। যেখানে শিশুরা খেলার মাধ্যমে ট্রাফিক আইনের বিভিন্ন বিষয়ে শিখতে পারবে। এ ছাড়া নগরবাসীর জন্য সেখানে একটি গণশৌচাগার তৈরি করে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই জায়গায় প্রথমে আমি গাছের চারা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সেগুলো এখন বড় হয়েছে। সেখানে এখন ফুল ফোটে, পাখি বসে, প্রজাপতি যায়। এলাকাবাসীও সেখানে ঘুরতে যায়।’
রাতের অন্ধকারে জায়গাটি অরক্ষিত থাকার বিষয়ে মেয়র বলেন, পার্কের নির্মাণকাজ করার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তখন ওই সমস্যাগুলো থাকবে না।