তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শুধু অপতথ্য বা গুজব চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। বরং এগুলো মোকাবিলায় দীর্ঘ মেয়াদে সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন। তথ্যের সঠিকতা বজায় রাখার জন্য একটি জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি এবং প্রযুক্তি পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তথ্য বিকৃতি, অপপ্রচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এবং এর ফলে দেশে তথ্যের সঠিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির ওপর সৃষ্ট প্রভাব নিয়ে মঙ্গলবার উচ্চপর্যায়ের এক নীতি সংলাপে আলোচকেরা এসব কথা বলেন।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যেকোনো আইনি বা নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি যেন অবশ্যই সুরক্ষিত থাকে।
জার্মানি ও নরওয়ে সরকারের সহায়তায় এবং ইউএনডিপি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘তথ্যাদির সঠিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি সংলাপ ২০২৬: নীতিমালা, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি ও সম্মিলিত উদ্যোগ’ শীর্ষক এ আয়োজন করা হয়। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে জানানো হয়।
উদ্বোধনী পর্বে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম একটি নির্ভরযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবার সম্মিলিত দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং তথ্য পরিবেশকে সবার জন্য উপকারী করতে নীতিগত কাঠামো ও জবাবদিহি শক্তিশালীকরণে সরকারের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
এ ছাড়া দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্য পরিবেশকে দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে সরকার, প্রিন্ট ও টেলিভিশন মিডিয়া ও অন্যান্য অংশীজনের একসঙ্গে দ্রুত কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
প্রযুক্তি পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত উদ্যোগের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন আর কেবল সাধারণ কোনো ব্যবহারের মাধ্যম নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক জীবন ও দৈনন্দিন বাস্তবতাকে পুরোপুরি বদলে দিয়ে এক নতুন পরিবেশ তৈরি করেছে।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল যুগের এই জটিল চ্যালেঞ্জগুলো কেবল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বা প্রযুক্তি জায়ান্টদের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়।…সবাইকে একসঙ্গে এসে এই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করতে হবে। একটি শক্তিশালী সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে নাগরিকেরা প্রযুক্তির কল্যাণ ও আশীর্বাদটুকু নিরাপদে ভোগ করতে পারেন।’
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশ মানুষের বাক্স্বাধীনতাকে অবারিত করেছে এবং তথ্য পরিবেশের ওপর মূলধারার গণমাধ্যমের একক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়েছে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, এই স্বাধীনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি কনটেন্ট তৈরি ও ব্যবহারকারী উভয়ের ওপর দায়িত্বশীলতার বোঝাও অনেকখানি চেপেছে।
তথ্যের সঠিকতা বজায় রাখার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়তে দ্য ডেইলি স্টার একটি বিশেষায়িত ‘ফ্যাক্ট-চেকিং ও ভেরিফিকেশন’ ইউনিট চালু করতে যাচ্ছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ইউএনডিপি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনলাইনে যাচাই করা কনটেন্টের অর্ধেকের বেশি ছিল অসত্য বা বিভ্রান্তিকর। এ ছাড়া প্রায় ২০ শতাংশের বেশি কনটেন্ট ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা বিকৃত করা। এই জটিল ডিজিটাল পরিস্থিতি সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও শান্তির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রডরিক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই-চালিত অপপ্রচারের প্রভাব শুধু ডিজিটাল জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলা ভাষার দক্ষতা বাড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সংলাপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট শীলা তাসনিম হক। অন্যদের মধ্যে ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি আবাসিক প্রতিনিধি সোনালী দয়ারত্নে ও ঢাকায় নিযুক্ত রয়্যাল নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন আলেকজান্ডার ফ্যালক-বিল্ডেন আলোচনায় অংশ নেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, তিনটি কর্ম অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী নীতিমালার খসড়া তৈরি করেন। এতে তথ্যের সঠিকতা বজায় রাখার জন্য একটি জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি, যেকোনো সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করার সমন্বিত ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরির জন্য অংশগ্রহণকারীরা দেশজুড়ে ডিজিটাল ও মিডিয়া শিক্ষার প্রসার, তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে হওয়া নারীর ওপর সহিংসতা রুখে দাঁড়ানোর তাগিদ দেন।