রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নতুন করে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ করা হয়েছে। গাছ কেটে নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের বিভিন্ন স্থাপনা। গতকাল বিকেলে
রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নতুন করে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ করা হয়েছে। গাছ কেটে নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের বিভিন্ন স্থাপনা। গতকাল বিকেলে

খরচা ১০৮ কোটি টাকা, ৯ বছর ধরে পার্কটি বন্ধ

৫ শতাংশ জায়গা স্থাপনা নির্মাণ নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। অক্টোবরে চালুর উদ্যোগ।

ভরদুপুর। আশ্বিনের ভ্যাপসা গরম ও রাজধানীর যানজট পার হয়ে পৌঁছালাম নগর ভবনের সামনে। একটু স্বস্তি পেতে গেলাম পাশের ওসমানী উদ্যানে। পার্কটির ফটকে নির্মাণকাজ চলছে। কিছুটা সংশয় নিয়ে পার্কের ভেতরে ঢুকলাম।

চারদিকে কংক্রিটের রাস্তা। এসব রাস্তার কিছু অংশ দীর্ঘদিন ব্যবহার হয়নি, সেটা বোঝা যাচ্ছে। কারণ, শেওলা জমেছে। বড় বড় ঘাস যেন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। এই ঘাসের মধ্যেই রোপণ করা হয়েছে চারাগাছ। ভেতরে দুটি জলাশয় (লেক) রয়েছে। তবে ১ নম্বর জলাশয়ে পানি নেই। ২ নম্বর জলাশয়ে পানি রয়েছে। তবে কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনার জন্য পানি দেখা যায় না। ভাসছে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ নানা কিছু।

কংক্রিটের নগরী ঢাকায় একসময় ওসমানী উদ্যান ছিল সবুজ গাছগাছালিতে ভরা। নগরের মানুষেরা স্বস্তি পেতে পার্কে নিয়মিত যেত, সেখানে বিশ্রাম নিত। আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া উন্নয়নকাজের কারণে ৯ বছর ধরে পার্কটি বন্ধ।

দিনটি ছিল ১৭ সেপ্টেম্বর। পার্কের এমন চিত্র দেখার পর কথা হয় নির্মাণশ্রমিক আতাউরের সঙ্গে। তিনি জানালেন, কয়েক বছর ধরে পার্কে নির্মাণকাজ চলার কারণে জনগণ বেড়াতে আসতে পারেনি। নির্মাণকাজ শেষ দিকে। পার্কটি শিগগির উদ্বোধন করা হবে বলে তিনি শুনেছেন।

কংক্রিটের নগরী ঢাকায় একসময় ওসমানী উদ্যান ছিল সবুজ গাছগাছালিতে ভরা। নগরের মানুষেরা স্বস্তি পেতে পার্কে নিয়মিত যেত, সেখানে বিশ্রাম নিত। আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া উন্নয়নকাজের কারণে ৯ বছর ধরে পার্কটি বন্ধ।

একটি চক্র আছে, যারা সিভিল বা ভারী কাজ বেশি করতে পছন্দ করে। কারণ, যত বেশি ভারী কাজ হবে, তত বাজেটও বাড়বে। এতে তাদের পকেটও ভারী হবে। ঠিক সেই কাজটি ওসমানী উদ্যানে হয়েছে।
—অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান, নগর–পরিকল্পনাবিদ

ওসমানী উদ্যানের অবস্থান রাজধানীর গুলিস্তানে ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয় নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে। আয়তন ২১ দশমিক ৮৫ একর। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর নামে নামকরণ। অনেকে ওসমানী উদ্যানকে ‘ঢাকার ফুসফুস’ও বলে থাকেন।

তবে পার্কটির সংস্কার ও উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে বহু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যদিও সে সময় পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁরা ‘ওসমানী উদ্যানের ১১ হাজার গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামের একটি প্লাটফর্ম থেকে আন্দোলনও করেছিলেন। তবে তাঁদের আপত্তিতে কান দেয়নি তৎকালীন সরকার। এতে পার্কটি অনেকটাই কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, পার্কটির উন্নয়নকাজে ইমারত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। বিধিমালা অনুযায়ী, পার্কের আয়তনের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গা স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। তবে তা উপেক্ষা করা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়নের নামে এত বছর পার্ক বন্ধ রেখে নাগরিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

দুই বছরের প্রকল্পে ৯ বছর পার

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তখনকার মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে।

২০১৭ সালে উন্নয়নকাজের দায়িত্ব পেয়েছিল দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। পরে ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। তারাই কাজ করছে।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি ফটক নির্মাণ শুরু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরে নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আনার ফলে নির্মাণ ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৩৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত ৯ বছরে কয়েক দফায় পার্কটিতে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকার বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

নির্মাণকাজ কাজ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে পিএফ করপোরেশনের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, তাঁরা কর্তৃপক্ষকে কাজ বুঝিয়েও দিয়েছেন।

ডিএসসিসি প্রশাসক মো.আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, অক্টোবরে পার্কটি জনসাধারণের জন্য খুলে দিতে পারবেন বলে আশা করছেন।

পার্কটিতে সিভিল (অবকাঠামো) কাজ বেশি করতে গিয়ে পার্কের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে। একটি চক্র আছে যারা সিভিল বা ভারী কাজ বেশি করতে পছন্দ করে। কারণ, যত বেশি ভারী কাজ হবে, তত বাজেটও বাড়বে। এতে তাদের পকেটও ভারী হবে। ঠিক সেই কাজটি ওসমানী উদ্যানে হয়েছে।
নগর–পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান

‘কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত’

১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে যেসব কাজ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, নগর জাদুঘর, একটি গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেশিয়াম, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, লেকের পাড় উন্নয়ন, ঘাট তৈরি, ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথ, বিদ্যুতের উপকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বরাদ্দ ৩৯ কোটি টাকায় ৯০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জ ধাতুর ওপরে জুলাই শহীদদের নাম খোদাই করা ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছে।

স্তম্ভের সঙ্গে অর্ধগোলাকার অংশে ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসসংবলিত ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। আর পার্কের দুই পাশের প্রবেশপথে ‘২৪’–এর ইংরেজি অক্ষরের অনুরূপ আকৃতির দুটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে।

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, পার্কটিতে সিভিল (অবকাঠামো) কাজ বেশি করতে গিয়ে পার্কের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে। একটি চক্র আছে যারা সিভিল বা ভারী কাজ বেশি করতে পছন্দ করে। কারণ, যত বেশি ভারী কাজ হবে, তত বাজেটও বাড়বে। এতে তাদের পকেটও ভারী হবে। ঠিক সেই কাজটি ওসমানী উদ্যানে হয়েছে।

পার্কের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে ভরে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি প্রকৃতিবান্ধব নকশা করে উন্নয়নকাজ করা হতো, তাহলে সাত মাসের বেশি সময় লাগত না। পার্কের চরিত্র যারা নষ্ট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া দরকার। যাতে আর কোনো পার্ক উন্নয়নের নামে এমন কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত না হয়।’