
শাপলা ফুল-পাতার নকশা আঁকা বেশ বড় আকারের একটি শঙ্খে ফুঁ দিয়ে কেমন শব্দ হয়, তা পরখ করে দেখছিলেন কৃতাঞ্জলি মজুমদার। পাশে বসা তাঁর স্বামী জহরলাল মজুমদার। গতকাল মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে তাঁরা পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের সুর প্রোডাক্টস থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে নতুন শাঁখা-পলা কিনতে এসেছিলেন। সেই সঙ্গে একটি শঙ্খও কিনলেন সুদূর হাতিয়া থেকে আসা এই দম্পতি।
শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাঁখারীবাজারের শাঁখা–পলা ও পূজার উপকরণের দোকানগুলো জমজমাট হয়ে উঠেছে বেচাকেনায়। গতকাল দুপুরে শাঁখারীবাজারে গিয়ে দেখা গেল, বাহাদুর শাহ পার্কের পশ্চিম পাশে শাঁখারীবাজারে প্রবেশের মুখেই পূজা উপলক্ষে সাজানো হয়েছে বিশালাকার সুদৃশ্য তোরণ। জনসন রোডের মুখ থেকে পোগজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান ফটক পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ছাউনি ফেলা হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য। শাঁখারীবাজারের প্রবেশমুখেই আরও একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে।
শাঁখারীবাজার সড়কের মাঝামাঝি স্থানে বেশ উঁচু মঞ্চ করে পূজার মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা দেখা গেল কর্মীদের। এর দুই পাশের দোকানে দোকানে ঝলমল করছে মণ্ডপ সাজানোর রঙিন কাগজ ও জরির মালা, শোলার কদম ফুলের ঝালর, প্রতিমার সাজসজ্জার রেশমি পোশাক, দেবীর হাতের খড়্গ, গদা, ত্রিশূলের মতো বিভিন্ন অস্ত্র, মালা-টিপ, আলোকসজ্জার প্রদীপ, ময়ূরের পালক, ঘট, প্রদীপসহ হরেক রকমের সামগ্রী। কোনো কোনো দোকানে বাজছে ভজন-কীর্তনের রেকর্ড। ধূপের ঘ্রাণ মিশে আছে বাতাসে। নানা বয়সী নারী-পুরুষ দোকানে দোকানে গিয়ে তাঁদের পছন্দের সামগ্রী কেনাকাটা করছেন।
শাঁখা–পলা কিনতে ভিড়
সুর প্রোডাক্টস নামের দোকানটি বেশ বড়। ভেতরে অনেক ক্রেতা দেখে প্রবেশ করে দেখা হলো ওই মজুমদার দম্পতির সঙ্গে। জহরলাল মজুমদার জানালেন, তিনি দুই দিন আগে ঢাকায় এসেছিলেন মূলত চিকিৎসার জন্য। গতকাল বিকেল পাঁচটার লঞ্চে হাতিয়ায় ফিরে যাওয়ার কথা। সামনে পূজা। তাই স্ত্রীর কৃতাঞ্জলির জন্য নতুন শাঁখা কিনতে তাঁরা এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে এসেছেন। সেই সঙ্গে একটি শঙ্খও কিনলেন। হাতিয়ার চেয়ে এখানে দাম অনেক কম। এক জোড়া স্বস্তিকার নকশা করা শাঁখা তাঁরা কিনেছেন ৭০০ টাকায়, হাতিয়াতে এর দাম অন্তত ১ হাজার ২০০ টাকা।
এই দোকান থেকে কয়েক জোড়া শাঁখা কিনলেন ওয়ারী এলাকার বাসিন্দা রেখা বণিক। তিনি জানালেন, পূজায় গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে যাবেন। প্রতিবারই পূজার আগে নিজের জন্য এক জোড়া নতুন শাঁখা কেনেন তিনি। আর গ্রামের বাড়ির পূজায় প্রতিমার জন্য শাঁখা কেনার দায়িত্বও থাকে তাঁর। শাঁখারীবাজার থেকে ভালো মানের শাঁখা কিনে নিয়ে যান। এবারও দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর জন্য আলাদা আলাদা তিন জোড়া শাঁখা কিনেছেন তিনি। দাম পড়েছে প্রতি জোড়া ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।
ব্যবসায়ী মণীন্দ্র সুর জানালেন, এটি তাঁদের বহু বছরের পারিবারিক ব্যবসা। শাঁখার দাম গতবারের মতোই আছে। প্রতি জোড়া সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। অনেক রকম নকশা থাকে শাঁখায়। সচরাচর স্বস্তিকা, সদানন্দ, অচিন্ত্য মানামানা, বেঁকি, পানপাতা ও শাপলা ফুলের নকশা করা শাঁখাই বেশি বিক্রি হয়।
আরেকটি শাঁখার দোকান ধর ভান্ডারের ব্যবসায়ী রাতুল ধর জানালেন, তাঁদের দোকানে সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা জোড়ার শাঁখাও রয়েছে। শাঁখার দাম নির্ভর করে এর মান, নকশা ও পুরুত্বের ওপর। বিবাহিত নারীরা নিয়মিত শাঁখা ব্যবহার করেন বলে সারা বছরই কিছু কিছু বিক্রি হয়। তবে দুর্গাপূজার সময় অনেকেই নিজের জন্য নতুন শাঁখা–পলা কেনার পাশাপাশি দেবী প্রতিমার জন্যও শাঁখা কেনেন। এ সময় প্রতিটি দোকানে শাঁখা ও পলা বিক্রি বাড়ে। পলার দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। শাঁখা–পলা ছাড়া এ সময় আলতা ও টিপও বিক্রি হয় যথেষ্ট। মানভেদে আলতার শিশির দাম ৩০ থেকে ১০০ টাকা। টিপের পাতা ১০ থেকে ২০ টাকা।
পূজায় সাজসজ্জার জন্য অনেক রকম মালা, টিপ, অলংকারের পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। লিটন নন্দীর দোকান কুশানে দেখা গেল, রঙিন রেশমি সুতা, কড়ি, লেইস, পুঁতির মতো অনেক রকম উপকরণ দিয়ে বিশেষ এক রকমের তৈরি মালা। এর লকেটে আছে দেবী দুর্গার মুখ। নাম ‘দুর্গা মালা’। আরেক রকম মালা আছে সব নীল রঙের উপকরণ দিয়ে তৈরি। লকেটে নীলকণ্ঠ শিবের প্রতিকৃতি। এর নাম ‘শিব মালা’। এসব মালা বিক্রি হচ্ছে নকশা অনুসারে প্রতিটি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এ ছাড়া ১০৮ দানার রুদ্রাক্ষের মালা ১২০ টাকা এবং ৮০ দানার মালা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।
প্রতিমার সাজসজ্জা
প্রতিমার সাজসজ্জার দোকানগুলো এখন ঝলমল করছে বৈচিত্র্যময় সামগ্রীতে। এমন একটি বড় দোকান শিল্পকুঠি। ব্যবসায়ী গোপাল নাগ জানালেন, সাজসজ্জার সামগ্রীর দাম প্রতিমার আকার ও সামগ্রীর গুণমানের ওপর নির্ভর করে। যেমন শাড়ি সর্বনিম্ন ১০০ টাকাতেও পাওয়া যায় আবার ৩ হাজার টাকার শাড়িও আছে। প্রতিমা সাজসজ্জার সামগ্রীর মধ্যে আরও আছে চুলের বেণি, অস্ত্র, অলংকার প্রভৃতি। এবার বিক্রির পরিমাণ কিছুটা কম বলে জানালেন এই ব্যবসায়ী। খরচ কমানোর জন্য অনেক পূজা কমিটির লোকজন এবার আলাদা করে শাড়ি বা অলংকার না কিনে প্রতিমা গড়ার সময়ই শিল্পীদের দিয়ে মাটির শাড়ি ও অলংকার তৈরি করিয়ে নিচ্ছেন। পরে মাটির শাড়ি ও অলংকারে রং করিয়ে নিচ্ছেন। এতে পূজা কমিটির খরচ কমছে বটে, তবে লেনদেনে কিছুটা ভাটার টান পড়েছে ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীরা জানান, পূজার শুরু পর্যন্ত চলতে থাকবে তাঁদের বেচাকেনার পর্ব। আগামী শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। সারা দেশের পূজামণ্ডপ জমে উঠবে আরতি–অঞ্জলিতে।