রাজধানীর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ক্যাকটাসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘ক্যাকটাস হাউস’ নামে স্বতন্ত্র একটি বাগান।
রাজধানীর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ক্যাকটাসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘ক্যাকটাস হাউস’ নামে স্বতন্ত্র একটি বাগান।

দোতলা ভবন ছাড়িয়ে গেছে ক্যাকটাসটি, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ৭২ প্রজাতির ক্যাকটাস

ক্যাকটাস বলতে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ছোট, কাঁটায় ভরা এক বিশেষ উদ্ভিদ। ঘরের কোনায় কিংবা বারান্দায় ছোট ছোট টবের মধ্যে শোভা পাওয়া এই কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। তবে রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা মিলেছে ব্যতিক্রমী এক ক্যাকটাসের। উচ্চতায় এটি ছাড়িয়ে গেছে পাশের দোতলা ভবনকেও। সামাল দিতে ছয়টি লোহার বেড়িও দেওয়া হয়েছে ক্যাকটাসটির গায়ে।

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে (বোটানিক্যাল গার্ডেন) প্রবেশের পর সোজা সড়ক ধরে এগোলে পরিচালকের কার্যালয়। ওই কার্যালয়ের বাঁ পাশে অতিথি ভবনের সঙ্গেই ক্যাকটাসটির দেখা পাওয়া যাবে। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্যাকটাসটির ইংরেজি নাম ‘সিরিয়াস ক্যাকটাস’ ও বৈজ্ঞানিক নাম ‘cereus hexogenus’। উচ্চতা এখন পর্যন্ত ২৫ ফুট। যেটি পাশের একটি দোতলা ভবনের ছাদ ছাড়িয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যভান্ডার জিআরআইএন-গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, এটি মূলত দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের স্থানীয় প্রজাতির ক্যাকটাস। ব্রাজিলের পারা ও রোরাইমা রাজ্যেও এর প্রাকৃতিক বিস্তার রয়েছে। লম্বা স্তম্ভাকৃতির এই ক্যাকটাসের প্রচলিত ইংরেজি নাম ‘ব্লু সিরিয়াস’ ও ‘টল কলামনার ক্যাকটাস’।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের কর্মকর্তা ও মালিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে মোহাম্মদপুরের এক ব্যক্তির বাসা থেকে ক্যাকটাসটি উদ্যানে আনা হয়। ওই ব্যক্তি জানিয়েছিলেন, তাঁর মা ক্যাকটাসটি পরিচর্যা করতেন। মা মারা গেছেন। তিনি বিদেশ চলে যাবেন। গাছটির দেখভাল বা পরিচর্যা করার মতো কেউ থাকবে না। তাই শখের গাছটি ফেলে না রেখে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যোগাযোগ করেন। পরে উদ্যান কর্তৃপক্ষ গাড়িতে করে গাছটি এনে রোপণ করে। কয়েক দিনের মধ্যে গাছ থেকে নতুন কাণ্ড বের হতে শুরু করে। উদ্ভিদ উদ্যান কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ না করায় ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। গাছটি উদ্যানে রোপণের সময় কর্মচারীদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের একজন উদ্যানের মালি আবদুল আলিম। ৩৫ বছর ধরে তিনি উদ্যানে মালির কাজ করেন। আবদুল আলিম ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, গাছটি যিনি দিয়েছিলেন, তাঁর মায়ের খুব শখের গাছ ছিল। তাঁর মা গাছটি পরিচর্যা করতেন। তাঁর মা মারা যাওয়ার পর তাঁর মায়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য গাছটি উদ্যানে দিয়েছিলেন।

১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগানের ক্যাকটাসগুলোর অধিকাংশই নেপাল, ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে

ক্যাকটাসের সমাহার

কয়েক বছর ধরে ক্যাকটাসের পরিচিতি বেড়েছে দেশে। বাসা-বাড়ির ছাদে, জানালার পাশে, বারান্দায়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলেও অনেকে শখের বসে ক্যাকটাস লাগান। মূলত ঘরের শোভাবর্ধনে তাঁরা এসব করেন। কেউ কেউ ক্যাকটাস বিক্রি করে আয়ও করছেন।

রাজধানীর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ক্যাকটাসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘ক্যাকটাস হাউস’ নামে স্বতন্ত্র একটি বাগান। সেখানে রয়েছে ৭২ প্রজাতির ক্যাকটাস। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেলোক্যাকটাস, ম্যামেলারিয়া ক্যাকটাস, নটো ক্যাকটাস, জিমনো ক্যালাইসিয়াম, ফেরোক্যাকটাস, গোল্ডেন ব্যারেল, ওল্ড ম্যান, ডিসকো ক্যাকটাস, জিমনোক্যালিসিয়াম, ক্লিস্টোক্যাকটাসসহ আরও নানা প্রজাতি। উদ্যানের সবচেয়ে পুরোনো ক্যাকটাসটি হলো গোল্ডেন ব্যারেল। এটির বয়স প্রায় ৩০ বছর।

ক্যাকটাসের কোনোটি ছোট ও গোলাকার, কোনোটি চ্যাপটা, আবার কোনো কোনো প্রজাতি স্তম্ভের মতো সোজা ওপরের দিকে বেড়ে ওঠে

উদ্যানের কর্মকর্তারা বলছেন, বাগানটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্যাকটাসগুলোর অধিকাংশই নেপাল, ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ক্যাকটাস পরিবারের সব উদ্ভিদ দেখতে এক রকম নয়। কোনোটি ছোট ও গোলাকার, কোনোটি চ্যাপটা, আবার কোনো কোনো প্রজাতি স্তম্ভের মতো সোজা ওপরের দিকে বেড়ে ওঠে। কিছু প্রজাতি প্রাকৃতিক পরিবেশে অনেক উঁচু হতে পারে। এদের অনেকের কাণ্ড পানি সঞ্চয় করে, যা শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করে।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ওই ক্যাকটাস হাউসে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘুরতে আসেন। এ ছাড়া গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাঁদের একাডেমিক কোর্সের আওতায় মাঠ সফরেও আসেন এখানে।

১৩ অক্টোবর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (৫৪তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা ‘সার্ভেয়িং অ্যান্ড স্টাডি ট্যুর’ শীর্ষক কোর্সের ব্যবহারিক অংশের আওতায় ফিল্ড ট্রিপে আসেন উদ্যানে। তাঁদের সঙ্গে বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন। তাঁরা উদ্যানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে দেখেন। এর আওতায় উদ্যানের ক্যাকটাস-বাগানও পরিদর্শন করেন।

রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের প্রধান ফটক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাসনীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে এত ক্যাকটাস একসঙ্গে কখনো দেখিনি। এখানে বহু ধরনের ক্যাকটাস দেখেছি। অপরিচিত সব ক্যাকটাস, বাহারি রং, বাহারি গড়ন, বাহারি সব ক্যাকটাস দেখে খুবই ভালো লেগেছে।’

ক্যাকটাস হাউসে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘুরতে আসেন

ক্যাকটাসগুলো মূলত বিভিন্ন গবেষণা ও শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করা হয় উল্লেখ করে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক শওকত ইমরান আরাফাত প্রথম আলোকে বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নিজেদের একাডেমিক কাজে এখানে পরিদর্শনে আসেন। তাঁরা গবেষণাও করেন। এ ছাড়া দর্শনার্থীরা আসেন। ক্যাকটাস-বাগানটি করার কারণ হলো যাতে দর্শনার্থীরা একই সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাকটাস সম্পর্কে জানতে ও গবেষণা করতে পারেন।