
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সৃজনশীল শক্তির প্রকাশ ঘটেছিল, সেই শক্তি ধরে রাখা ও এর বিকাশ ঘটানো জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর সৃজনশীলতার বিরুদ্ধে নানা শক্তির দাপট দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে, যারা গান সহ্য করতে পারে না, ছবি আঁকা সহ্য করতে পারে না; ভাস্কর্য ভাঙে; শিল্পীদের বাধা দেয়, চলচ্চিত্র প্রদর্শনেও বাধা দেয়। তিনি বলেন, সৃজনশীলতাবিরোধী বিভিন্ন শক্তির একটা ভয়ংকর দাপট দেখতে পাচ্ছি। এটি গণ-অভ্যুত্থানের শক্তির সম্পূর্ণ বিপরীত যাত্রা।’
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ‘জুলাইয়ের ডাক’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথাগুলো বলেন আনু মুহাম্মদ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদদের স্মরণে সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ চার দিনের এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এতে সহযোগিতা করছে সিটি ব্যাংক।
আনু মুহাম্মদ বলেন, জুলাইকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হলেও প্রদর্শনীটি শুধু ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে নয়। এখানে দীর্ঘকাল ধরে মানুষের ওপর চলা নির্যাতন, মানুষের কান্না, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সাক্ষ্য রয়েছে। যুগের পর যুগ অত্যাচার যেমন শেষ হয়নি, তেমনি মানুষের প্রতিরোধও শেষ হয়নি। এই প্রদর্শনী সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের শক্তির কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু অত্যাচারের ইতিহাস নয় বলে মনে করিয়ে দেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। এই শিক্ষাবিদ বলেন, এটি মানুষের প্রতিরোধ ও নির্মাণের ইতিহাসও। একই সঙ্গে এই ইতিহাস প্রত্যাশা ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসও।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানুষের মধ্যে যে অসাধারণ সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছিল, সেটির কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, গান, ছবি, গ্রাফিতি, অডিও-ভিডিওসহ নানা মাধ্যমে মানুষ তাঁদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে এই সৃজনশীলতার গভীর সম্পর্ক ছিল।
বক্তব্যে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, এমন একটি সরকার পাওয়া গেছে, যারা জনগণের লড়াইয়ের বিপরীত দিকে গিয়ে, জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে নানা কাজে তৎপর বলে মনে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ফুলবাড়ী আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন। আগস্ট মাসেই ফুলবাড়ী আন্দোলনের ঘটনা ঘটেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এখন জনগণের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ঘোষণা করতে চায় বলে মনে হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে লেখক রেহনুমা আহমেদ বলেন, শিল্পীর ভূমিকা শুধু দর্শকের মনে কোনো অনুভূতি তৈরি করা নয়; বরং প্রশ্ন তোলা, অস্বস্তিতে ফেলা এবং বাস্তবতাকে সুস্পষ্ট করে দেখানো। তিনি বলেন, শিল্পীর কাজ মানুষকে নাড়া দেওয়া এবং প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো। তাঁর মতে, শিল্পীকে সমাজের বিবেক হতে হবে। শিল্পী যদি বিবেকের ভূমিকা পালন না করেন, তাহলে তাঁর বিচারে তিনি শিল্পী নন।
‘জুলাইয়ের ডাক’ প্রদর্শনীর কয়েকটি শিল্পকর্মের কথা উল্লেখ করে এই লেখক বলেন, জুলাই মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, ‘আমি পারি, আমাদের পারতে হবে।’ আরেকটি শিল্পকর্মে দমন-পীড়নের প্রতীক হিসেবে ‘হেলমেট বাহিনী’সহ নানা শক্তির উপস্থিতি তাঁকে জুলাইয়ের পরও নতুন রূপে মানুষের ওপর দমন-পীড়নের আশঙ্কার কথা মনে করিয়েছে। তাঁর ভাষায়, এসব শিল্পকর্ম শুধু অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়নি; বরং স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং জুলাইকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহাও তৈরি করেছে।
প্রদর্শনীর শিল্পী অমল আকাশ বলেন, এবারের প্রদর্শনীতে ২৫ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এসব শিল্পকর্মে তুলে ধরা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর শিল্প ও শিল্পীদের ওপর আঘাতের বিষয়টি প্রদর্শনীতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আয়োজকেরা জানান, আজ শুক্রবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া প্রদর্শনী চলবে আগামী সোমবার পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য প্রদর্শনীটি উন্মুক্ত থাকবে।
সমগীতের সহসভাপ্রধান বীথি ঘোষের সঞ্চালনায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনী পর্বে আরও বক্তব্য দেন একই সংগঠনের সভাপ্রধান রেবেকা নীলা।