দীর্ঘদিন ধরে চলা উন্নয়নকাজ শেষে খুলে দেওয়া হয়েছে ওসমানী উদ্যান। গতকাল সেখানে বেশ কিছু দর্শনার্থীকে দেখা যায়
দীর্ঘদিন ধরে চলা উন্নয়নকাজ শেষে খুলে দেওয়া হয়েছে ওসমানী উদ্যান। গতকাল সেখানে বেশ কিছু দর্শনার্থীকে দেখা যায়

অবশেষে খুলল ওসমানী উদ্যান, তবে ঢুকতে টিকিট লাগছে

ওসমানী উদ্যানের অবস্থান রাজধানীর গুলিস্তানে ডিএসসিসি প্রধান কার্যালয় নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে। আয়তন ২১ দশমিক ৮৫ একর।

উন্নয়নের নামে ৯ বছর বন্ধ রাখার পর অবশেষে খুলেছে ওসমানী উদ্যান। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে উদ্যানটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্যানে ঢুকতে জনপ্রতি ১০ টাকা ফি নিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন দর্শনার্থীদের কেউ কেউ।

এর আগে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্যানটি উদ্বোধন করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা বলছেন, উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে ৯ বছর নগরবাসীকে উদ্যান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন প্রবেশের ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার মাধ্যমে নগরবাসীকে সেখানে যেতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যানের পরিবেশ সুন্দর রাখাসহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রবেশমূল্য রাখা হচ্ছে। উদ্যানের আশপাশে হকারসহ বিভিন্ন মানুষ থাকে। তারা উদ্যান অপরিষ্কার করে ফেলতে পারে। প্রবেশমূল্য রাখা না হলে দেখা যাবে তারা উদ্যানে ঢুকে মলমূত্র ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। উদ্যান পরিষ্কারে প্রতিদিন ১৫–১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দরকার। এসব কারণে প্রবেশমূল্য রাখা হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারণ করে ওসমানী উদ্যানের প্রবেশপথে তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের ফটক। গুলিস্তান, ঢাকা, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ফেসবুকে উদ্যানটি খুলে দেওয়ার কথা জানতে পেরে সকালে সন্তানকে নিয়ে উদ্যানে ঘুরতে আসেন রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন। ফটকে প্রবেশের সময় তাঁকে টিকিট কিনতে বলায় বিস্মিত হন তিনি। রাবেয়া খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে দেখলাম, পার্কটি খুলে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চা নিয়ে পার্কে এলাম। গেটেই দুজন থামিয়ে হাতে টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বলেন, দুজনের জন্য ২০ টাকা দেন। এত বছর বন্ধ রাখার পর চালু হলো; কিন্তু ঢুকতে আবার টাকা দিতে হবে—এটা কেমন নিয়ম?’

এটা জনগণের সঙ্গে প্রহসন। পার্ক, খেলার মাঠ ইত্যাদি জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। সেখানে জনগণের কাছ থেকে ফি নেওয়া অন্যায্য।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান, নগর-পরিকল্পনাবিদ

উদ্যানের ফটকে যাঁরা টিকিট বিক্রি করছেন, তাঁদের একজন মোহাম্মদ হানিফ। তিনি ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পার্কে উন্নয়ন করতে গিয়ে এত টাকা খরচ হয়েছে। টাকা না দিলে এই টাকা সরকার ওঠাবে কীভাবে? সিটি করপোরেশন থেকে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমরা দায়িত্ব পালন করছি।’

ওসমানী উদ্যানের অবস্থান রাজধানীর গুলিস্তানে ডিএসসিসি প্রধান কার্যালয় নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে। আয়তন ২১ দশমিক ৮৫ একর। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামে উদ্যানটির নামকরণ করা হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পাশে কয়েকজন দর্শনার্থী। গতকাল ওসমানী উদ্যানে

রাজধানী ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে খেলার মাঠ ও ফাঁকা জায়গা কম। হাঁটাচলা ও বিশ্রামের জন্য নগরবাসীর জন্য রাজধানীতে কয়েকটি পার্ক রয়েছে। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক অন্যতম। এ দুটি বড় পার্কে ঢুকতে টাকা লাগে না। এমনকি ওসমানী উদ্যান বন্ধ হওয়ার আগেও কোনো প্রবেশ ফি নেওয়া হতো না। তবে সংস্কার ও উন্নয়নকাজের পর এখন প্রবেশের ক্ষেত্রে টাকা নেওয়া হচ্ছে।

উদ্যানে প্রবেশের ক্ষেত্রে ফি নেওয়া জনগণকে পার্কে আসার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা জনগণের সঙ্গে প্রহসন। পার্ক, খেলার মাঠ ইত্যাদি জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। সেখানে জনগণের কাছ থেকে ফি নেওয়া অন্যায্য। যাঁরা রেগুলার (নিয়মিত) পার্কে হাঁটাচলা করতে যান, ফি নেওয়া হলে তাঁরা নিয়মিত যাবেন না। সে ক্ষেত্রে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, পার্কে প্রবেশের ফি নির্ধারণ না করে সরকারের উচিত, কেন একটি উদ্যানে অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে টাকা অপচয় করা হলো, কেন কংক্রিট দিয়ে পার্কের চরিত্র নষ্ট করা হলো—তার তদন্ত করা।

গতকাল বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে উদ্যানে ঘুরে দেখা গেছে, উদ্যানের মধ্যে থাকা দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি নেই। আর ২ নম্বর জলাশয়ে পানি থাকলেও সেটি আবর্জনায় ভরা। পানির ওপর কচুরিপানা ও প্লাস্টিকের বোতল ভাসতে দেখা গেছে। এ ছাড়া উদ্যানের মধ্যে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে, তাদের নির্মাণসামগ্রী রাখা রয়েছে।

কমেছে সবুজ

ওসমানী উদ্যানে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে। গুলিস্তান, ঢাকা, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ওসমানী উদ্যানকে অনেকে ‘ঢাকার ফুসফুস’ বলে থাকেন। এ উদ্যানে একসময় অনেক গাছপালা ছিল। তবে গত কয়েক বছর উন্নয়নের নামে পার্কের সংস্কার ও নির্মাণকাজ করতে গিয়ে বহু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।

যদিও সে সময় পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁরা ‘ওসমানী উদ্যানের ১১ হাজার গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে আন্দোলনও করেছিলেন। তবে তাঁদের আপত্তিতে কান দেয়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার। এতে পার্কটি অনেকটাই কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, পার্কটির উন্নয়নকাজে ইমারত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। বিধিমালা অনুযায়ী, পার্কের আয়তনের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। তবে তা এখানে উপেক্ষা করা হয়েছে।

দুই বছরের প্রকল্পে ৯ বছর পার

ওসমানী উদ্যানের ভেতরের ওয়াকওয়ে ও সবুজায়নের একাংশ। এক পাশে কংক্রিটের তৈরি বেঞ্চে একজনকে শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। গুলিস্তান, ঢাকা, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তখনকার মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে।

২০১৭ সালে উন্নয়নকাজের দায়িত্ব পেয়েছিল ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। পরে ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি ফটক নির্মাণ শুরু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরে নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আনার ফলে নির্মাণ ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৩৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত ৯ বছরে কয়েক দফায় পার্কটিতে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকার বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

সংস্কারকাজ শেষ করে উদ্যান চালু করা হলেও ভেতরের জলাশয়ে আবর্জনা ও শেওলা দেখা যায়। গুলিস্তান, ঢাকা, ২০ অক্টোবর ২০২৬

১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে যেসব কাজ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, নগর জাদুঘর, একটি গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেসিয়াম, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, লেকের পাড় উন্নয়ন, ঘাট তৈরি, হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে, বিদ্যুতের উপকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি; আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বরাদ্দ ৩৯ কোটি টাকায় ৯০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জ ধাতুর ওপরে জুলাই শহীদদের নাম খোদাই করা ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও পার্কের দুই পাশের প্রবেশপথে ‘২৪’-এর ইংরেজি অক্ষরের অনুরূপ আকৃতির দুটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে।

পার্কটি উদ্বোধন করা হলেও জাদুঘর, গ্রন্থাগার, জিমনেসিয়াম, পার্কিং ও খাবারের দোকানগুলো এখনো চালু হয়নি।

এ বিষয়ে পার্কের সংস্কার ও উন্নয়নকাজের প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগকে পার্কটি বুঝিয়ে দিয়েছি। যত দিন না কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা বা অপারেট (পরিচালনা) করার জন্য দেওয়া হচ্ছে, তত দিন সিটি করপোরেশন নিজেরা এটি রক্ষণাবেক্ষণ করবে—এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই ফটকে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’