বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ভিড়। রাজধানীর মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ভিড়। রাজধানীর মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে

ভাইরাল ভিডিও দেখে হাসপাতালটিতে আসছেন অনেক রোগী, বিপাকে চিকিৎসকেরা

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের (৫৫) বাড়ি চাঁদপুরে। দীর্ঘদিন ধরে পায়ের ব্যথায় ভুগছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখেছিলেন, রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। বিভিন্ন থেরাপিও দেওয়া হয়। সে সূত্রেই জাহাঙ্গীরের ঢাকায় আসা।

সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করে চিকিৎসক দেখিয়েছেন জাহাঙ্গীর। তবে তাঁকে জানানো হয়েছে, এখন রোগীর চাপ অনেক বেশি। নতুন করে থেরাপির সিরিয়াল দেওয়া যাবে না। বেশকিছু ওষুধ লিখে দিয়ে থেরাপির জন্য দুই মাস পর মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে তাঁকে।

এতে খানিকটা বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ জাহাঙ্গীর। ১১ আগস্ট সকালে হাসপাতালের ফটকে যখন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হয়, তখন ক্ষুব্ধ হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বললেন, ‘সকাল ছয়টার সময় আইছি। আইয়া ১০ টাকা দিয়ে টোকেন লইছি। দশটা বাজছে ডাক্তার দেখাইতে। ডাক্তার কয়, এহন আর থেরাপি নাই। লোক সব ভত্তি হয়ে গেছে। আঠারো শ টাকার ওষুধ লেখে দিছে। এডি এত টাকা দিয়া কেনা লাগলে ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়া এত দূর আইলাম কেন?’

গত মাসের শেষের দিকে ‘লাইফ স্টোরি’ নামের একটি ফেসবুক পেজে রাজধানীর সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নিয়ে ভিডিও প্রচার করা হয়। ভাইরাল হয় ভিডিওটি। পরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম হাসপাতালটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ ও বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়া যায়—এমন খবরে হাসপাতালটিতে রোগীর সংখ্যা রাতারাতি বেড়ে গেছে। আগে এখানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতেন। এখন সংখ্যাটি হাজার ছাড়িয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরের মতো অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন।

বহির্বিভাগে আকুপাংচার চিকিৎসা নিতে আগাম সিরিয়াল দিতে হয়। সেই সিরিয়াল এখন আগামী বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
সোহরাব হোসেন, সহকারী অধ্যাপক, সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসকদের। সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীরা বিনা মূল্যে সব ওষুধ পাবেন ভেবে এসেছিলেন—সেটাও পাচ্ছেন না। হাসপাতালটিতে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক—এ দুই শাখা মিলিয়ে ৪৫ জন শিক্ষক ও চিকিৎসক কর্মরত। সেখানকার সহকারী অধ্যাপক সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হুট করে এত রোগী বেড়ে যাওয়ায় সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

চিকিৎসার অংশ হিসেবে রোগীদের যোগব্যায়াম করানো হচ্ছে। রাজধানীর মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে

সোহরাব হোসেন আরও বলেন, ‘বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া ও রোগী ভর্তি রাখার পাশাপাশি আমরা এখানে আকুপাংচার, হিজামা, পঞ্চকর্ম ও ইয়োগা করিয়ে থাকি। বহির্বিভাগে আকুপাংচার চিকিৎসা নিতে আগাম সিরিয়াল দিতে হয়। সেই সিরিয়াল এখন আগামী বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।’

‎আজ সোমবার সকালে হাসপাতালটিতে গিয়ে বেশ ভিড় দেখা যায়। চিকিৎসক দেখানোর জন্য টিকিটের সারি ভবনের বাইরে অবধি পৌঁছে গেছে। ফেসবুকে ভিডিও দেখে অনেকে এসেছেন। আবার দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন অনেক রোগী।

নোয়াখালী থেকে এসেছেন মাহমুদা খাতুন (৪০)। গত সোমবার ভিড়ের কারণে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে না পেরে ফিরে যান তিনি। এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। পরদিন আবার এসেছেন।

মাহমুদা বলেন, ফেসবুকে ভিডিও দেখে তিনি এসেছেন। তবে বুঝতে পারেননি যে এখানে এত ভিড় থাকবে। এত দূর থেকে যেহেতু এসেছেন, তাই কষ্ট হলেও চিকিৎসক দেখিয়ে, তবেই ফিরবেন।

‎সরকারি সরঞ্জামের স্বল্পতা থাকায় আকুপাংচারের জন্য প্রয়োজনীয় নিডল (সুচ) ও জীবাণুনাশক রোগীদের কিনতে হচ্ছে। এতে খরচ হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা। এ ছাড়া রোগীদের অধিকাংশ ওষুধ নিজেদেরই কিনতে হচ্ছে। তাতেও চিকিৎসার খরচ বাড়ছে।

অনেক রোগী এসে ঘুরে যাচ্ছেন। বলছেন, আমরা নাকি হয়রানি করছি। তাঁরা কেউ বুঝছেন না, আমাদের ধারণক্ষমতা কম, লোকবল কম। আমরা তো ভিডিওটি করিনি, ফেসবুকে দেইনি।
মুতাসিম বিল্লাহ, ইন্টার্ন চিকিৎসক, সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

হাসপাতালটিতে প্রায় ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন অফিস সহকারী শামসুর রহমান। তিনি বলেন, রোগীর এমন ভিড় আগে কখনো দেখেননি। বেলা তিনটা পর্যন্ত টিকিট দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকেরা বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থাকছেন। তবু সব রোগী দেখা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসক দেখানোর জন্য টিকিট কেনার সারি হাসপাতাল ভবনের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে

ইন্টার্ন চিকিৎসক মুতাসিম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক রোগী এসে ঘুরে যাচ্ছেন। বলছেন, আমরা নাকি হয়রানি করছি। তাঁরা কেউ বুঝছেন না, আমাদের ধারণক্ষমতা কম, লোকবল কম। আমরা তো ভিডিওটি করিনি, ফেসবুকে দেইনি।’

‎‎হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার শিক্ষক–চিকিৎসকদের ২৫ মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ আছে। এরপরও সবাই কাজ করে গেছেন। এখন কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। কর্মঘণ্টার বাইরেও সেবা দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে তাঁরা হতাশা।