
রাজধানীর জনপথ মোড় থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল পর্যন্ত মানুষের দীর্ঘ সারি। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কাঁধে বস্তা, কেউ আবার ছোট শিশু কোলে দাঁড়িয়ে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঈদের আগে বাড়ি ফিরতে চান সবাই।
কিন্তু বাস পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব বাস পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। কোথাও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও আবার যাত্রীভেদে নেওয়া হচ্ছে আলাদা ভাড়া।
আজ সোমবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে জনপথ মোড় থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সায়েদাবাদ ছাড়াও জনপথ মোড়সহ আশপাশের বিভিন্ন পয়েন্টে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জনপথ মোড়ে খুলনাগামী বখতিয়ার পরিবহনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েকজন যাত্রী। তাঁদের একজন অভিযোগ করেন, একই বাসে কারও কাছ থেকে ৬০০ টাকা, আবার কারও কাছ থেকে ৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। পরিবহনটির বাস চালকের সহকারী রাকিব বলেন, ‘আমাদের কাছে তাও ৭০০ পাচ্ছেন, কাউন্টারে ১ হাজার টাকা।’
বরিশালগামী আফরা এক্সপ্রেসের নন-এসি বাসের ভাড়া চাওয়া হচ্ছিল ৮০০ টাকা। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই রুটে ভাড়া থাকে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে। বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গাড়ির এক কর্মী বলেন, ‘আমি কিছু জানি না।’ পিরোজপুরগামী যাত্রী মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘টিকিট নাই। আবার যেগুলোর আছে, ভাড়া বেশি চাইতাছে। এখন না গেলে বাড়ি যাইতেও পারুম না।’
ভাড়া বেশি রাখা হচ্ছে কেন জানতে চাইলে পিরোজপুরগামী ইমাদ পরিবহনের কাউন্টারে দায়িত্বরত লিটন বলেন, ‘আপনি যে আলোর রিপোর্টারই হন না কেন—বড় করে লিখে দেন।’
ছেলেকে নিয়ে খুলনা যাওয়ার জন্য জনপথ মোড়ে এসেছিলেন মনোয়ারা বেগম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও টিকিট পাননি। তিনি বলেন, ‘কী করব বুঝতে পারছি না। ধোলাইপারের দিকে যাব এখন। ওখানে গাড়ি পাওয়া যায় কি না, দেখি।’
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের কাছেই জোনাকি সার্ভিস লাইন কাউন্টারের সামনে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছিলেন শাহেদ আলম। প্রায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাসে উঠতে পারেননি। হতাশ হয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়ি ফিরতেও যদি এমন ভোগান্তি পোহাতে হয়…’।
এই পরিবহন কাউন্টারের সামনে ছিল দীর্ঘ লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী বিরক্তির সুরে বলেন, ‘টিকিট নাই, দেখেন না? সেই কখন থেইকা খাড়ায়া আছি।’
জানতে চাইলে কাউন্টার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেন, আগের দিন রাত ও সকালে যেসব বাস বিভিন্ন জেলায় গেছে, সেগুলোর অনেকগুলো এখনো ঢাকায় ফেরেনি। ফলে বাসের সংকট তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই দুপুর ১২টার পর নামে ঝুম বৃষ্টি। জোনাকি সার্ভিস লাইন কাউন্টারের সামনে থাকা যাত্রীরা মুহূর্তেই ভিজে যায়। কেউ ব্যাগ মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয় নেন টার্মিনালের ছাউনির নিচে। অনেক শিশুকে ভেজা কাপড়ে কাঁদতে দেখা যায়। বৃষ্টির মধ্যেও কাউন্টারগুলোর সামনে কমেনি মানুষের ভিড়।
শেষ পর্যন্ত দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি বাস এসে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে কাউন্টারের সামনের সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে গেছে। তখনো থামেনি বৃষ্টি।
গাড়ি আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হুড়োহুড়ি শুরু হয় যাত্রীদের মধ্যে। কেউ শিশু কোলে নিয়ে পানির মধ্য দিয়েই এগিয়ে যান, কেউ মালপত্র মাথায় তুলে বাসের দিকে ছোটেন। কয়েকজন রিকশা ভাড়া করে পানির ভেতর দিয়ে গাড়ির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ভেজা কাপড়, কাদা আর বৃষ্টির মধ্যেই কোনোভাবে বাসে উঠতে দেখা যায় ঘরমুখী মানুষদের।