সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেলে আহত হয় পথশিশু আবদুল্লাহ। ঢাকা, ৫ অক্টোবর
সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেলে আহত হয় পথশিশু আবদুল্লাহ। ঢাকা, ৫ অক্টোবর

‘আমারে মার কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা কইরা দেন’

রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছে ১১ বছর বয়সী পথশিশু আবদুল্লাহ। তার বাঁ পায়ে ব্যান্ডেজ। সেখানে ক্ষত গভীর। একটু নড়াচড়া করলেই ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে তার শরীর।

এই পরিস্থিতিতে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা আবদুল্লাহর। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আবদুল্লাহ এই প্রতিবেদককে বলে, ‘এখানে এমনে থাকতে আর ভাল্লাগে না। আমি মার কাছে ফিরা যাইতাম চাই। মার কাছে থাইক্কা পড়ালেখা করবার চাই। আমারে মার কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা কইরা দেন।’

১ অক্টোবর দুপুরে সদরঘাট এলাকার রাস্তায় শুয়ে ছিল আবদুল্লাহ। সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা তার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে তার বাঁ পায়ের পাতা থেঁতলে গিয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

দুর্ঘটনার পর আবদুল্লাহকে উদ্ধার করে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ার একটি ভবনের নিচে এনে রাখেন তুফান নামের এক ব্যক্তি। সেখানে নোংরা কাপড় দিয়ে পায়ের ক্ষতস্থান পেঁচিয়ে দিন কাটছিল তার। দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ১৩ অক্টোবর এই প্রতিবেদকের উদ্যোগে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসক আবদুর রহমান বলেন, আবদুল্লাহর পায়ে মারাত্মক সংক্রমণের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাকে হাসপাতালে আরও কিছুদিন চিকিৎসা নিতে হবে।

তুফান বলেন, চিকিৎসকেরা তাঁকে জানিয়েছেন, আবদুল্লাহর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে খরচের বিষয় আছে। শিশুটির চিকিৎসাসহ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সহযোগিতা দরকার।

আবদুল্লাহর পথজীবনের শুরু হয়েছিল বছর কয়েক আগে। সে জানায়, তার বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়। তার মায়ের নাম নূর নাহার, বাবা মালেক। পরিবার ভেঙে গেলে সে একা হয়ে পড়ে। পরে লঞ্চে করে সদরঘাটে চলে আসে আবদুল্লাহ। এরপর সদরঘাটের ফুটপাতই হয় তার ‘বসতি’।

কখনো প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে তা বিক্রি করে খাবার খেয়েছে আবদুল্লাহ। কখনো খেয়েছে অন্যের কাছে চেয়ে। আবার কখনো না খেয়েই দিন পার করেছে সে।

দুর্ঘটনার পর আবদুল্লাহকে উদ্ধার করা ব্যক্তি তুফান বলেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে ছেলেটির আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হলে তাকে হয়তো বেঁচে থাকার তাগিদে আবার সদরঘাটের ফুটপাতেই ফিরতে হবে।

আবদুল্লাহ জানে না তার মা–বাবা এখন কোথায় আছেন। তবে সে বিশেষ করে তার মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায়। যেতে চায় স্কুলে।

হাসপাতালে থাকা আবদুল্লাহ জানান, তার মা অন্যত্র বিয়ে করেছেন। তাই তিনি তাকে এখন গ্রহণ করবেন কি না, তা জানা নেই।

আবদুল্লাহর এখন একটাই চাওয়া, মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া। সে বলে, ‘কেউ যেন আমার মায়ের খোঁজ দেয়। আমি মায়ের কাছে থেকে লেখাপড়া করতে চাই।’

‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, শিশুটি অল্প বয়সে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। অথচ এই বয়সে তার পড়াশোনা ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা। নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ দিতে পারলে শিশুটির স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।