জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা আছে কি না, তা লম্বা হাতলের চামচ দিয়ে পরীক্ষা করছেন সিটি করপোরেশনের এক কর্মী। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা আছে কি না, তা লম্বা হাতলের চামচ দিয়ে পরীক্ষা করছেন সিটি করপোরেশনের এক কর্মী। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঘুরে ঘুরে এডিস মশা ধ্বংস

ওয়াসার মিটার বাক্স: চামচে তুলে আনা পানিতে কিলবিল করছিল মশার লার্ভা

ঢাকা ওয়াসার পানির সংযোগের মিটার বাক্সটি বাইরে থেকে ঢাকনা দেওয়া। ঢাকনা খুলতেই দেখা গেল, বাক্সটি চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর। নিচে জমে আছে পানি। ওপর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সেই পানিতে মশার লার্ভা আছে কি না।

পরীক্ষার জন্য লম্বা হাতলের গোল চামচ নামানো হলো বাক্সের পানিতে। চামচভর্তি পানি ওপরে তুলতেই দেখা গেল, পানিতে কিলবিল করছে মশার লার্ভা। পরে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা সেখানে মশার ওষুধ ছিটিয়ে লার্ভাগুলো ধ্বংস করেন।

আজ শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বনানীর ২৬ নম্বর সড়কের রাজউক কোয়ার্টারে এ দৃশ্য দেখা যায়। ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ‘একশোতে একশো’ শীর্ষক বিশেষ কর্মসূচি চালাচ্ছে।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালেই মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে জড়ো হন ডিএনসিসির মশা নিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কুইক রেসপন্স দলের সদস্য, বিডি ক্লিনের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীসহ শতাধিক মানুষ। সেখানে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরীসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও ছিলেন।

সকাল পৌনে ৯টার দিকে দলগুলোর সদস্যদের ব্রিফ করেন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। কোথায় কীভাবে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে হবে, কোন জায়গায় কোন ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে এবং বাসিন্দাদের কীভাবে সচেতন করতে হবে, এসব বিষয়ে তাঁদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সকাল ৯টার দিকে ১০টি দল নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

প্রতিটি দলে ছিলেন একজন সুপারভাইজার, চার থেকে পাঁচজন ওষুধ ছিটানোর কর্মী, কুইক রেসপন্স দলের তিনজন সদস্য, দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং বিডি ক্লিনের পাঁচ থেকে ছয়জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী।

ডেঙ্গু ঠেকাতে ঢাকা উত্তর সিটির ‘একশোতে একশো’ কর্মসূচিতে অংশ নেন মশকনিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ কর্মসূচির ষষ্ঠ দিন ছিল শুক্রবার। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত ১৫ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উত্তর সিটির আওতাধীন হাসপাতালগুলো থেকে ১ হাজার ৬৭৮ ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের ঠিকানা বিশ্লেষণ করে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ ১০০টি এলাকা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করে ধ্বংস করাই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

রোগীর ঠিকানাভিত্তিক নজরদারি, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী, জিও-ট্যাগ করা প্রজননস্থলের তথ্য, উৎসস্থল কমানো এবং মশার ঘনত্ব পরিমাপ—এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনা হচ্ছে বলেও জানান প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

‘আমরা প্যারাসিটামল-নাপা খাইতেই থাকি’

মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠ থেকে প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার দূরে সরকারি তিতুমীর কলেজের পাশে রাজউকের যান্ত্রিক ওয়ার্কশপ। ডিএনসিসির কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালে সেখানে যান ৬ নম্বর দলের সদস্যরা।

ওয়ার্কশপে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি ভারী যান ও যন্ত্রপাতি। এক্সকাভেটর, বুলডোজার, চেইনডোজার, ডাম্প ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন রাখা হয়েছে সেখানে। একটি এক্সকাভেটরের খনন করা অংশে পানি জমে ছিল। পাশে পড়ে থাকা বড় একটি পুরোনো টায়ারের ভেতরেও পানি জমে ছিল। সেখানে জন্মেছে আগাছা, আর পানিতে ছিল মশা।

ওই জায়গায় মোড়কের ভেতরে বিস্কুট রাখার ওয়ানটাইম একটি পাত্রে পানি জমে ছিল। ওই জমা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এ ছাড়া এক্সকাভেটরের ওপর পড়ে থাকা একটি খোলা বোতলেও পানি জমে ছিল। আশপাশে পড়ে ছিল প্লাস্টিকের বাটি, বোতলসহ নানা পাত্র। বৃষ্টি হলে এসব পাত্রে পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জায়গাটিতে দাঁড়াতেই মশা এসে কামড়াচ্ছিল।

ওয়ার্কশপের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজউকের কর্মী সাদ্দাম হোসেন আনসার ব্যারাকেই থাকেন। সপ্তাহখানেক আগে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। প্রায় ১০ দিন হাসপাতালে থাকার পর আজ সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে গেছেন।

আরেক আনসার সদস্য রুবেল রানা বলেন, সেখানে মশার উৎপাত অনেক বেশি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা প্যারাসিটামল-নাপা খাইতেই থাকি।’ চার মাস ধরে তিনি সেখানে আছেন। এ সময়ে মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কাউকে ধোঁয়া দিতে দেখেননি বলেও জানান তিনি।

‘এখানে সোর্সের কোনো অভাব নাই’

সকাল ১০টার দিকে বনানীর ২৬ নম্বর সড়কের রাজউক কোয়ার্টারে যায় ডিএনসিসির ১ নম্বর দল। সুপারভাইজার আবদুল কুদ্দুসের নেতৃত্বে দলটিতে সদস্য ছিলেন ১৬ জন।

গাছগাছালিতে ঘেরা আবাসিক এলাকাটিতে তখন মশার ওষুধ ছিটাচ্ছিলেন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। স্বেচ্ছাসেবীরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, ওয়ানটাইম কাপসহ পানি জমতে পারে এমন পাত্র সংগ্রহ করছিলেন।

পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার পর সেখানে মশকনিধন ওষুধ ছিটাচ্ছেন ডিএনসিসির কর্মী। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দলের সদস্যরা জানান, এর আগে চারটি জায়গায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একটি ওয়ানটাইম পাত্র, দুটি পণ্যের মোড়ক এবং একটি নারকেলগাছে তৈরি গর্তের পানিতে লার্ভা পাওয়া যায়। এসব জায়গায় ওষুধ ছিটিয়ে পানি ফেলে দেওয়া হয়।

এরপরই পাওয়া যায় ঢাকা ওয়াসার পানির সংযোগের মিটার বাক্সটি। বাক্সের পানিতে বিশেষ চামচ দিয়ে পরীক্ষা করে পাওয়া যায় মশার লার্ভা। পরে সেখানে ওষুধ ছিটিয়ে দেন মশা নিধনকর্মীরা।

সুপারভাইজার আবদুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই জায়গায় তাদের বারবার নোটিশ করা হয়েছে, কিন্তু তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে না। এডিসের লার্ভা সব সময়ই এখানে পাওয়া যায়। এখানে সোর্সের (উৎসস্থল) কোনো অভাব নাই।’

কোয়ার্টারের বাসিন্দা ও রাজউকের প্রধান শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন বলেন, আবাসিক এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কর্মী নিয়োগ করা হলেও তাঁরা ঠিকমতো কাজ করেন না। কর্মীদের তদারকও করা হয় না। আবার অনেক বাসিন্দা ভবনের জানালা দিয়ে ময়লা-আবর্জনা বাইরে ফেলে দেন।

গিয়াস উদ্দিন আরও বলেন, ওই আবাসিক এলাকার ১২ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটের একজন বাসিন্দা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।