রাজশাহী নগর

করোনাকালে পড়ে আছে গোটা একটি হাসপাতাল

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন সিটি হাসপাতালটি এক বছর ধরে পড়ে আছে। একসময় ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিত ছিল এটি।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যখন রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন সিটি হাসপাতালটি এক বছর ধরে পড়ে আছে। একসময় ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিত ছিল এটি। এখন এই হাসপাতাল থেকে নগরবাসী আর কোনো সেবা পান না।

একসময় এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ওষুধসহ সেবা পেতেন রাজশাহী নগরবাসী। আর ৭৫ টাকা দিয়ে নাম নিবন্ধন করে ১০ মাসব্যাপী সেবা পেতেন প্রসূতি মায়েরা। সিটি করপোরেশন ২০১৮–১৯ অর্থবছরে হাসপাতালটি মাসিক এক লাখ টাকা চুক্তিতে মেডিকেল যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়। গত বছরের মার্চ থেকে তারা চলে গেছে। আসবাব ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ঝকঝকে, তকতকে একটি হাসপাতাল পড়ে আছে।

জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান বলেন, এই হাসপাতালের জায়গায় দুটি আলাদা ভবন করা হবে। এ জন্য তাঁরা ৪৫–৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তুত করেছেন। হাসপাতালটি সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হবে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রচুর রোগীর চাপ। এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ৭ জুলাই বহির্বিভাগে ৯৪০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। জরুরি সেবা নিয়েছে ৩৩৩ জন। ভর্তি ছিল ১ হাজার ১৯০ জন। এই চিত্র প্রায় দিনেরই। এই সময় সিটি হাসপাতালটি চালু থাকলে রোগীর চাপ কিছুটা হলেও তারা নিতে পারত।

* একসময় এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১০ টাকায় টিকিট কেটে সেবা পাওয়া যেত। * লোকসান হওয়ায় হাসপাতাল ইজারা নেওয়া ঢাকার ব্যবসায়ী বছরখানেক আগে চলে গেছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী নগরের রানিনগর এলাকায় এই হাসপাতালটি অবস্থিত। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৫ সালে ২৫ শয্যার এই হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। প্রথমে এর নামকরণ করা হয় শ্রমজীবী হাসপাতাল। এর সংস্কারকাজ শেষ হয় ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৯ সালে নাম পরিবর্তন করে সিটি হাসপাতাল রাখা হয়। ২০০০ সালের ১৬ মে হাসপাতালের বহির্বিভাগের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। পরের বছর থেকে প্রসবসেবা ও অন্তর্বিভাগ কার্যক্রম চালু করা হয়। সে সময় ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে একজন রোগী এক সপ্তাহের ওষুধসহ চিকিৎসা নিতে পারতেন।

হাসপাতালটি বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালনার জন্য ভাড়া দিতে ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এরপর ‘সেলট্রন’ নামের মেডিকেল যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ ফাউজুল মুবিনকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য হাসপাতালটি ভাড়া দেওয়া হয়। তাঁরা ১০০ টাকা টিকিট নিয়ে বহির্বিভাগে রোগী দেখা শুরু করেন। প্রায় এক বছর চালানোর পর গত বছরের মার্চে তাঁরা হাসপাতালটি বন্ধ করে দিয়ে চলে যান। হাসপাতালের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ জন কর্মচারী ছিলেন।

গত রোববার এই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পাড়ার দুটি শিশু বহির্বিভাগে বসে খেলছে। হাসপাতালের সদর দরজা খোলা পাওয়া গেল। পরিবেশটা এখনো বেশ পরিপাটি রয়েছে। ভেতরে গা ছমছম করা পরিবেশ। কিন্তু কোনো একটি কক্ষ থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে আসছিল। একটি কক্ষের সামনে যেতেই চার-পাঁচজন নারীকে পাওয়া গেল। জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, তাঁরা ইপিআই কর্মী। হাসপাতালটি পড়ে আছে। তাই তাঁরা একটি কক্ষ খুলে তাঁদের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তাঁদেরই একজন বললেন, ঢাকার যে ব্যবসায়ী হাসপাতাল ভাড়া নিয়েছিলেন। লোকসান হওয়ার কারণে তিনি বছরখানেক আগে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন।

জানতে চাইলে সেলট্রনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ ফাউজুল মুবিন বলেন, তাঁরা এক বছর প্রতিষ্ঠানটি ভালো চালিয়েছেন। বহির্বিভাগে প্রথম দিকে ১০০ টাকা ফি নিয়ে রোগী দেখা শুরু হয়। পরে অন্তর্বিভাগের মানোন্নয়ন করে সেখান থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বহির্বিভাগে বিনা মূল্যে রোগী দেখা শুরু করা হয়েছিল। করোনা শুরু হলে গত বছরের মার্চে সিটি করপোরেশন তাঁদের হাসপাতালটি তিন মাসের জন্য বন্ধ রাখতে বলে। এরপর করোনা পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছিল না। আর হাসপাতালের সামনে ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে প্রসূতি মায়েরা এই হাসপাতালে আসতে পারছিলেন না। এ জন্য সিটি করপোরেশনকে রাস্তাটি মেরামত করে দিতে বলা হয়েছিল। তারা সেটা করেনি। এসব কারণে হাসপাতালটি আবার চালু করা সম্ভব হয়নি।

ফাউজুল মুবিন বলেন, তাঁরা এই হাসপাতালটি নেওয়ার পরে সবকিছু পাল্টে ফেলেছিলেন। মেঝে ও দেয়ালের টাইলস পর্যন্ত তাঁরা নতুন করে লাগিয়েছেন। নবায়ন কাজেই তাঁদের ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। নিজেরা আধুনিক যন্ত্রপাতি বসিয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনি আড়াই কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন সিটি করপোরেশন অন্য কাউকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর বিনিয়োগ তিনি আর তুলে আনতে পারবেন না।