করোনায় বিপর্যস্ত পরিবারের প্রতীকী ছবি
করোনায় বিপর্যস্ত পরিবারের প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাসের ক্ষত সহজে শুকাবে না

গ্রামে যে কারও বিপদে-আপদে সবার আগে ছুটে যেতেন পল্লিচিকিৎসক শেখ ইয়াদ আলী (৬৪)। গ্রামে কেউ মারা গেলে গোসল-দাফন করাতেন নিজ হাতে। মৃত ব্যক্তি অসচ্ছল হলে দান করতেন কাফনের কাপড়। কিন্তু মৃত্যুর পর গ্রামে তাঁর লাশ দাফন করা নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। গোসল-দাফন করাতে লোক আনতে হয় পাশের জেলা খুলনা থেকে। দাফন শেষ হতে না হতেই খবর আসে মারা গেছেন ইয়াদ আলীর বড় ছেলে খানজাহান আলী শেখ (২৪)। বাবা-ছেলে দুজনের মৃত্যুই করোনায়।

শেখ ইয়াদ আলীর বাড়ি দক্ষিণের জেলা বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বাহিরদিয়া-মানসা ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া গ্রামে। স্থানীয় গাবখালী বাজারে ছিল তাঁর ডিসপেনসারি। এলাকার বিদ্যানুরাগী কয়েকজনকে নিয়ে সেখানে গড়ে তোলেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষকতা করতেন সেই বিদ্যালয়ে। চিকিৎসক হিসেবেও তাঁর বেশ পরিচিতি ছিল। খুব সচ্ছল না হলেও অভাব ছিল না পরিবারে।

গ্রামের বীরমানি খালের পাড়ে ইয়াদ আলীর বাড়ি। ১৬ আগস্ট দুপুরে সেই বাড়িতে কথা হয় ইয়াদ আলীর স্ত্রী শাহিনুর বেগম (৫০) ও ছোট ছেলে শাহ্ সামার্থ আলীর (২২) সঙ্গে। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, বাজারের ডিসপেনসারিতে আসা মানুষকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে ইয়াদ আলী নিজেই করোনায় আক্রান্ত হন, পরে সংক্রমণ ছড়ায় পুরো পরিবারে। গত ১১ জুলাই সকালে খুলনার ডায়াবেটিক হাসপাতালে ইয়াদ আলীর মৃত্যুর ৭ ঘণ্টা পর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তাঁর বড় ছেলে খানজাহান আলী শেখ। এরপর বদলে যায় সব।

করোনায় বিপর্যস্ত শাহিনুর বেগমের পরিবার। এখনো তাঁরা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেননি। শাহিনুর বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কী রোগে কী হয়ে গেল! বড় ছেলেটার বিয়ে দিতে চাইছিলাম। আল্লাহ এখন যেভাবে চালান।’

‘কী রোগে কী হয়ে গেল! বড় ছেলেটার বিয়ে দিতে চাইছিলাম। আল্লাহ এখন যেভাবে চালান।’
শাহিনুর বেগম

অর্থনৈতিক ঝুঁকি

ব্যক্তির মৃত্যুতে পরিবারের আয় ও উপার্জন বন্ধ হয়েছে কারও উপার্জন আংশিক কমেছে, কারও অর্ধেক। আছে সামাজিক সংকট।

বাগেরহাটের এই পরিবারে উপার্জনক্ষম ছিলেন দুজন। ইয়াদ আলীর উপার্জনের ভিত্তি ছিল গ্রামীণ চিকিৎসাসেবা। বড় ছেলে খান জাহান স্বাস্থ্য বিভাগে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে কাজ করতেন। এখন পরিবারটির উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে।

করোনায় এ রকম হঠাৎ বিপদে পড়েছে বহু পরিবার। করোনায় ব্যক্তির মৃত্যুতে পরিবারের আয়–উপার্জন বন্ধ হয়েছে, অনেকের জীবিকা বন্ধ হয়েছে, কারও উপার্জন আংশিক কমেছে, কারও অর্ধেক। দেশের বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। মহামারি শুরু হওয়ার এক মাস পর এপ্রিলে গ্রামের ৫০ শতাংশ ও শহরের বস্তি এলাকার ৩২ শতাংশ পরিবার আয়মূলক কাজে জড়িত ছিল। মে মাসে লকডাউন তুলে দেওয়ার পর আয়ের সুযোগ কিছু বাড়ে। তারপর এখনো ১৭ শতাংশ পরিবারের কোনো আয়মূলক কাজ নেই। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশ। মহামারি শুরুর আগে এই হার ছিল ২২ শতাংশ। ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠান দুটি অনলাইন সেমিনারে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে। অবশ্য অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন তাঁর পর্যালোচনায় বলেন, দারিদ্র্য বেড়ে ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংক্রমণের কোনো বাছবিচার নেই, ধনী-দরিদ্র সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে এর প্রভাব শ্রেণিভেদে, শহর-গ্রামভেদে সামান্য কমবেশি দেখা যাচ্ছে। কুমিল্লার সামন্তলাল চৌধুরী রাজধানীর একটি পরিচিত হোটেলে ২০ বছর ধরে চাকরি করছেন। মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতনের সঙ্গে দৈনিক বকশিশ দেড়-দুই হাজার টাকা উপার্জন ছিল। বাংলামোটর এলাকায় ২৩ হাজার টাকার ভাড়া বাসায় থাকেন। তাঁর দুই মেয়ে পড়ে রাজধানীর একটি স্কুলে। মার্চ মাস থেকে হোটেল বন্ধ, সঙ্গে বেতন। বকশিশের তো প্রশ্নই ওঠে না। এরই মধ্যে তাঁর স্ত্রী আক্রান্ত হন করোনায়। বেসরকারি হাসপাতালে বিল আসে আড়াই লাখ টাকার বেশি। মহামারির শুরুর দিকে সংসার চলেছে সঞ্চয়ের টাকায়। স্ত্রীকে চিকিৎসা করাতে পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েদের স্কুল না থাকলে গ্রামেই ফিরে যেতেন। সামন্তলাল চৌধুরী কম ভাড়ার বাসা খুঁজছেন। খুব শিগগির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে হোটেল চালু না হলে তাঁর পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা বা এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য সামন্তলালের কম ভাড়ার বাসা দরকার। ঢাকা শহরে বহু এলাকায় এখন বাসা ভাড়ার বিজ্ঞপ্তি টাঙানো। দুই কক্ষের বাসায় যাঁরা থাকতেন, তাঁরা হয়তো এক কক্ষকে উপযুক্ত মনে করছেন। কিছু ক্ষেত্রে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শুধু ঢাকায় থাকছেন, পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। পিপিআরসি ও বিআইজিডির যৌথ গবেষণা বলছে, ঢাকার বস্তির ১৬ ও চট্টগ্রামের বস্তির ৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বা অন্য জেলায় চলে গেছে।

সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাকে বিশ্বব্যাপী পন্থা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি মন্থর হয়েছে বা থেমে গেছে। বহুজাতিক বা জাতীয় প্রতিষ্ঠানে বা ফুটপাতের দোকানে এর প্রভাব পড়েছে। ফলে অনেকের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেছে।

কাজ হারিয়ে আত্মহত্যার কাহিনিও শোনা গেছে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভান্ডারগাঁও গ্রামের মুকুন্দ বড়ুয়া ৩০ জুন রাতে তাঁর দুই কিশোরী মেয়েকে মেরে ভোরবেলা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। এক দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। বিপত্নীক মুকুন্দ বড়ুয়া খুলনার একটি লাইটার জাহাজে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। মার্চে লকডাউন শুরু হলে তিনি খুলনা থেকে চট্টগ্রামে চলে যান। আত্মীয়দের ধারণা, চাকরি চলে যাওয়ার কারণে সন্তান হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

সামাজিক সংকট

করোনা সন্দেহে তাপমাত্রা পরীক্ষা। প্রতীকী ছবি
‘বাবা বিপদে–আপদে সব সময় মানুষের পাশে থাকতেন। যে কারও প্রয়োজনে ছুটে যেতেন। কিন্তু এখন এই রোগের কারণে সবাই আমাদের অন্য চোখে দেখে। আমরা হেঁটে গেলে পরিচিতজনেরা রাস্তার অন্য পাশে সরে যান।’
জান্নাতুল, বাগেরহাটের পল্লিচিকিৎসক ইয়াদ আলীর মেয়ে

বাগেরহাটের পল্লিচিকিৎসক ইয়াদ আলীর মেয়ে জান্নাতুল মাওয়ার বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে। জান্নাতুল চাকরি করেন হোসলা কমিউনিটি ক্লিনিকে। বাবা ও ভাই করোনায় মারা যাওয়ায় তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁদের। জান্নাতুল বলেন, ‘বাবা বিপদে–আপদে সব সময় মানুষের পাশে থাকতেন। যে কারও প্রয়োজনে ছুটে যেতেন। কিন্তু এখন এই রোগের কারণে সবাই আমাদের অন্য চোখে দেখে। আমরা হেঁটে গেলে পরিচিতজনেরা রাস্তার অন্য পাশে সরে যান।’

পরিবারটির প্রতি সমাজের এই আচরণ শুরু হয়েছিল ইয়াদ আলীর মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছানোর পর।

১৮ মার্চ দেশে করোনায় প্রথম মৃত্যু হয়। দাফন বা কবর দেওয়া নিয়ে সামাজিক সমস্যার কথা তখনই শোনা গিয়েছিল। রাজধানীর খিলগাঁও-তালতলা কবরস্থানে করোনায় মৃত ব্যক্তিকে দাফন করতে গেলে এলাকার মানুষ বাধা দেন। এলাকাবাসী বলেছিলেন, দাফন হলে ওই কবরস্থান ও আশপাশে করোনা ছড়িয়ে পড়বে এবং এলাকার মানুষ সংক্রমিত হবে। অবশ্য সরকার পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে উদ্ধৃত করে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায় যে মৃত ব্যক্তি সংক্রমণ ছড়ায় না।

করোনাভাইরাস জীবাণুটি অতি ক্ষুদ্র হলেও অনেক বড় সামাজিক সমস্যা তৈরি করে চলেছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনডিপি) অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের ‘পিস অবজারভেটরি’ শীর্ষক প্রকল্প শুরু থেকেই মহামারি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ও তথ্য সংগ্রহ করছে। তাদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দাফন বা সৎকারের ৬১টি ঘটনায় স্থানীয় মানুষ বাধা দিয়েছে।

শুধু দাফনে বাধা দেওয়া নয়, আরও নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বিশ্লেষণে। তাতে দেখা গেছে, করোনা রোগীকে বা রোগীর পরিবারকে বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ১২টি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয় ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবারকে সহায়তা করার জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে হয়রানি ও আঘাতের ১৩টি ঘটনার কথা জানা গেছে। চিকিৎসকদের অজ্ঞতা ও চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতির ঘটনা ৬৯টি।

এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে অজ্ঞতাজনিত আতঙ্ক থেকে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বারবার বলেছেন, মহামারি বিষয়ে মানুষকে ঠিক সময়ে ঠিক তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। ঝুঁকিসম্পর্কিত যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততা বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষ নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। তাই আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ অনেক অস্বাভাবিক আচরণ করেছে।

এই মহামারি প্রতিদিনের জীবন ও বিশ্বাসে গভীর পরিবর্তন এনেছে। মায়ের শরীরে করোনার সংক্রমণ ঘটেছে, এই সন্দেহে সন্তানেরা রাতের অন্ধকারে মাকে জঙ্গলে ফেলে যায়। ১৩ এপ্রিল এই ঘটনা ঘটে টাঙ্গাইলের সখীপুরে। ওই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মাকে জঙ্গলে ফেলে আসার চেয়ে অমানবিক আর কিছু হতে পারে না। এ ঘটনা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিক্যাল বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ঘটনাটিকে স্বার্থপর প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ বলা যেতে পারে। ভয় থেকে সমাজের অনেকেই নানা রকম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। সন্তানেরা ভয় পেয়েছেন, ভয় থেকে স্বার্থপর আচরণ করেছেন। সঠিক তথ্য ও জ্ঞান থাকলে এমন হতো না।

১ মার্চ থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত আত্মীয়স্বজন বা সহকর্মীদের কাছ থেকে পরিত্যাগ বা ছেড়ে যাওয়ার ৪৬টি ঘটনার তথ্য পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতিষ্ঠান। ইউনিসেফ ও ইউএনএফপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, করোনার কারণে শিশু নির্যাতন বেড়েছে, পারিবারিক সহিংসতাও বেড়েছে।

চাপে শিক্ষার্থীরা

বাগেরহাটের ইয়াদ আলীর ছোট ছেলে শাহ্ সামার্থ আলী শেখ (২২) খুলনার আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন। খুলনার একটি মেসে থাকতেন তিনি। মাদ্রাসা ও মেস বন্ধ হওয়ায় মার্চ মাস থেকে বাড়িতে আছেন। বাবা ও বড় ভাই মারা যাওয়ায় পর মা ও সংসার দেখার দায়িত্ব এখন তাঁর। তাঁর পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

১৮ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এর প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর ওপর।

করোনা সংক্রমণ সম্পর্কে সঠিক পূর্বাভাস না থাকায় শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। স্কুলের পরীক্ষার পাশাপাশি এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট বাড়ছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। দরিদ্র পরিবারের ও অনেক গ্রামের শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তির এই সুযোগ গ্রহণ করার ক্ষমতা নেই। এই উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে বলে অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি ও বেতন নিয়েও নানা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ভাইরাস সবখানে

করোনাভাইরাস পরীক্ষার প্রতীকী ছবি।

করোনার সংক্রমণ শুরু চীনের উহানে। ভাইরাসটি বাগেরহাটের সবুজ গ্রামে কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল, তা কেউ বলতে পারে না। এই জেলায় এ পর্যন্ত ৭৮৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন, এর মধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। এ ছাড়া করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৪০ জন।

সংক্রমণের চার মাস পরও দেশের দক্ষিণের এই জেলায় করোনা পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপন করতে পারেনি সরকার। এই জেলার নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয় খুলনা ও যশোরের ল্যাবরেটরিতে। বাগেরহাটের মতো দেশের ৩৯টি জেলায় এখনো পরীক্ষাকেন্দ্র নেই। দেশের সব মানুষ করোনা পরীক্ষার সমান সুযোগ পাচ্ছেন না, এ ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে। দেশে এখন ৯১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হচ্ছে, এর মধ্যে ৫৪টি ঢাকায়।

গুরুতর করোনা রোগীর চিকিৎসায় বাগেরহাট জেলায় একটিও আইসিইউ শয্যা নেই। ইয়াদ আলীর চিকিৎসা চলছিল খুলনার ডায়াবেটিক হাসপাতালে। চিকিৎসার একপর্যায়ে ১০ জুলাই ইয়াদ আলীর আইসিইউয়ের দরকার হয়। হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি ছিল না। পরদিন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।

ইয়াদ আলীর পরিবার মৃত্যুর ক্ষত ভুলবে না। সমাজও ভুলবে না মহামারিতে অসংখ্য চিকিৎসক, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিসহ বহু সাধারণ মানুষের মৃত্যু। এটাই মহামারির প্রথম অভিজ্ঞতা নয়। তবে ইতিহাসের অন্য মহামারির সঙ্গে এর পার্থক্য এই যে করোনা মহামারি শুধু স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেনি, সমানভাবে প্রভাবিত করেছে সমাজ ও অর্থনীতিকে। মহামারি শেষ হবে, অর্থনীতির চাকাও সচল হবে, তবে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে তা শুকাবে না।