রাঙামাটি

দুর্গম পাহাড়ে টিকা নিয়ে দুর্ভাবনা

বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির ১১টি ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় দেড় লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করতে পারেননি।

করোনা টিকা
প্রতীকী ছবি

যোগাযোগব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার লোকজন টিকাবঞ্চিত হচ্ছেন। এসব এলাকা থেকে টিকাকেন্দ্রে আসতে এক থেকে দেড় দিন সময় লাগে। নেটওয়ার্ক না থাকায় টিকার নিবন্ধনও করতে পারছেন না এসব এলাকার লোকজন। ওই সব এলাকায় বসবাস করা জেলার অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষের টিকাদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জেলার দুর্গম এলাকার মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম হলো বাঘাইছড়ির সাজেক, বরকলের বড়হরিণা, ভূষণছড়ার একাংশ, জুরাছড়ির দুমদুম্যা ও বিলাইছড়ি উপজেলা বড়থলি ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা থেকে সদরে আসতে দুই থেকে চার দিন সময় লাগে। দুর্গম এসব এলাকায় জ্বর-সর্দি ও কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে করোনা পরীক্ষার জন্য তাঁদের নমুনা সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের শিয়ালদাই লুই ও ব্যাটলিং মৌজার বিভিন্ন গ্রাম থেকে সবচেয়ে কাছের বাঘাইহাট টিকাকেন্দ্রে পৌঁছাতে এক থেকে দেড় দিন সময় লাগে। এসব এলাকার কেউ টিকা নেননি। তবে এলাকাগুলোতে জ্বর-সর্দি ও কাশির প্রকোপ দেখা দিয়েছে সম্প্রতি।

ব্যাটলিং মৌজার লংতিয়ান পাড়ার লক্ষ্মী সাধন চাকমা বলেন, ‘আমাদের টিকাকেন্দ্রে আসতে দুই থেকে তিন দিন লাগবে। কীভাবে টিকা নেব দুশ্চিন্তায় পড়েছি। আমাদের গ্রামের কাছাকাছি যদি টিকাকেন্দ্র বসানো হয়, তখন নিতে পারব।’

সাজেক ইউনিয়নের শিয়ালদাই লুই মৌজার হেডম্যান জৈপুই থাং ত্রিপুরা বলেন, তিনি নিজেও জ্বরে ভুগছেন। তাঁর মৌজা ও আশপাশের অনেক এলাকায় জ্বর-সর্দির প্রকোপ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে হওয়ায় এসব এলাকার কেউ করোনার টিকা নেননি। মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় টিকার নিবন্ধনও করেননি তাঁরা।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি উপজেলাসহ অন্তত ছয়টি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের দেড় লাখের বেশি মানুষ দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করেন। মুঠোফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় এসব এলাকার মানুষ টিকার নিবন্ধনও করতে পারেননি।

* দুর্গম হওয়ায় জেলার অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষের টিকাদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। * দুর্গম এলাকায় জ্বর-সর্দি ও কাশির মতো করোনার উপসর্গ দেখা গেলেও পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।

দুর্গম এলাকার লোকজনের দাবি, বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হোক। ১০ আগস্ট জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়নে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে এমন বিশেষ ব্যবস্থায় ৩০০ টিকা নেওয়া হয়। এরপর ওই এলাকার বাসিন্দাদের টিকা দেওয়া হয়।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিরানন্দ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখন করোনা উপসর্গ নিয়ে ঘরে ঘরে অসুস্থ মানুষ রয়েছে। নমুনা পরীক্ষা করলে অধিকাংশের করোনা পজিটিভ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নমুনা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পাহাড়ি লতাপাতা ও সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মুঠোফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় টিকার নিবন্ধনও করতে পারেননি এই ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ।’

‘আশপাশের অনেক এলাকায় জ্বর-সর্দির প্রকোপ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে হওয়ায় এসব এলাকার কেউ করোনার টিকা নেননি। মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় টিকার নিবন্ধনও করেননি তাঁরা।’
জৈপুই থাং ত্রিপুরা, হেডম্যান, শিয়ালদাই লুই মৌজা

জুরাছড়ির দুমদুম্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাধন কুমার চাকমা বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন করোনার টিকা নেওয়ার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় মানুষ টিকা নিতে পারছেন না। আমার ইউনিয়নে বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে কোনো টিকা পাবেন না মানুষ। গরিব জুমচাষিরা দুই থেকে তিন দিন হেঁটে টিকা নিতে আসতে পারবেন না।’

সিভিল সার্জন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে করোনার টিকা দেওয়া হচ্ছে। ৭ আগস্ট গণটিকাদানসহ এ পর্যন্ত প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৪৩৬ জনকে। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ২৯ হাজার ৭৭ জনকে। এ পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৮২৬ জনের কাছ থেকে। করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৫৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের। সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৬৫২ ও চিকিৎসাধীন আছেন ৭৭৬ জন।

সিভিল সার্জন বিপাশ খীসা বলেন, ‘দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় টিকা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব। যদি বিশেষ ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে টিকা দেওয়া হবে। ১০ আগস্ট হেলিকপ্টারে করে বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়নে টিকা দেওয়া হয়েছে।’