
এবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক কী বক্তব্য দেন, সেই আশায় অনেকেই বসে আছেন। গত বছরের আগস্টে এক কর্মসূচিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, টিকা ছাড়াই দেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথে। এ বছরও নিশ্চয়ই তিনি নতুন কিছু শোনাবেন।
এক বছর পর দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখে শুধু টিকা আর টিকা। কোথা থেকে কত টিকা আসবে, কোন কোম্পানির টিকা, কোন দেশের টিকা, কত মানুষকে টিকা দেওয়া হবে, কীভাবে টিকা দেওয়া হবে—অনর্গল এসব বলে চলেছেন। মুখ খুললেই করোনার টিকা। গত বছরের বক্তব্যের সঙ্গে আজকের কথার মিল নেই। নিন্দুকেরা অসংলগ্নতা খুঁজে পাচ্ছেন।
আজকাল এ কথা প্রায়ই শোনা যায় যে সাংবাদিকেরা না শুনে, না বুঝে অনেক কথাই লিখে ফেলেন। অথবা অর্ধেক শুনে লেখেন। তাই সে দিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথা হুবহু তুলে দেওয়া হলো।
জাহিদ মালেক সেদিন বলেছিলেন, ‘করোনা আজ আমাদের দেশ থেকে বিদায় নেওয়ার পথে। আক্রান্তের বিবেচনায় করোনায় মৃত্যুহার আমাদের দেশে অনেক কম। বলা চলে, ভ্যাকসিন ছাড়াই দেশ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্য অনেকটাই চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রলাপ করার মতো।
এই বক্তব্যের মধ্যে জানা-বোঝার অভাব যেমন আছে, তেমনি আছে বিজ্ঞানবিমুখতা। মহামারি সম্পর্কে মানুষ যখন কিছুই জানতেন না; টিকা কী, টিকার কাজ কী—এসব সম্পর্কে মানুষের যখন কোনো ধারণা ছিল না, তখন সুযোগ থাকলে হয়তো এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হতো। মহামারিবিজ্ঞান যা যা করতে বলেছে, তা দেখার সৌভাগ্য দেশের মানুষের হয়নি। মানুষ পেয়েছে মধ্যযুগীয় আশ্বাস।
এ রকম উদাহরণ আরও আছে। প্রতিদিন অসংলগ্নতার নতুন নতুন নজির দেশবাসীর সামনে হাজির হচ্ছে। সর্বশেষ উদাহরণ ৭ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া গ্রামপর্যায়ে করোনার টিকাদানকে কেন্দ্র করে। ১ আগস্ট জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘আগামী ৭ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত এই ৭ দিনে উৎসবমুখর পরিবেশে দেশের মানুষকে অন্তত ১ কোটি ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। দেশের ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সর্বত্র এই টিকা উৎসব চলবে।’
মহাখালীর বিসিপিএস মিলনায়তনে ২০২০-২১ সালের প্রথম বর্ষ এমবিবিএস ক্লাস শুরুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেছিলেন। অনেক তরুণ শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন, অনেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। এখন এই তরুণেরা জানছেন, পুরোটাই ঢপ।
প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছেন আর মন্ত্রীর মুখে উৎসবের আমেজ। তিনি উৎসব করতে চান। কিন্তু উৎসব করার মতো মানসিক অবস্থা দেশের মানুষের আছে? উৎসব করার মতো টিকার ভান্ডার কি মন্ত্রী গড়ে তুলতে পেরেছেন? এসবই যে অন্তঃসারশূন্য বুলি, তা বুঝিয়ে দিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।
শুক্রবার, অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কোটি টিকা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের মাত্র পাঁচ দিন পর দেশব্যাপী টিকা দেওয়ার নতুন পরিকল্পনার কথা জানালেন আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এখন কথা হচ্ছে, দুজনের পরিকল্পনায় এত ফারাক কেন? মৃদুভাষী জাহিদ মালেক এত ভুল কথা কেন বলছেন?
বিজ্ঞান বলছে, মহামারির মোকাবিলায় ঠিক তথ্য ঠিক সময়ে দিতে হবে। ঠিক তথ্য না পেলে, ভুল তথ্য পেলে, আংশিক তথ্য পেলে মানুষ বিভ্রান্ত হন। বিভ্রান্ত মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, এমনকি ভুল সিদ্ধান্ত নেন। বারবার একই ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষ, মন্ত্রী, সরকার, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। মহামারির সময় আস্থা নষ্ট হলে মানুষ পরীক্ষা করাতে পারেন না, হাসপাতালে যেতে চান না। তাতে সংক্রমণ কমে না, মৃত্যু বাড়ে।