রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) বরাদ্দ দেওয়া প্লট পেতে গ্রাহকদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৪ বছর ঘুরেও অনেকে নিজ নামে প্লট বুঝে পাননি। মালিকদের নামে ভুয়া রেজিস্ট্রি (দলিল নিবন্ধন) করে দিয়েছে আরডিএ। অথচ এখনো সেই জমি সংস্থাটি নিজ নামে অধিগ্রহণ করতে পারেনি।
এদিকে, অধিগ্রহণ না করেই আবারও নতুন আবাসিক এলাকার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে আরডিএ চন্দ্রিমা বাণিজ্যিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের ১২টি প্লট বরাদ্দ দেয়। আজ পর্যন্ত মালিকদের সেই প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং ছয়জন মালিককে ভুয়া দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি ধরা পড়ে। মালিকেরা জানতে পারেন, তাঁদের প্রকৃত প্লটের দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হয়নি। ভুয়া দাগ নম্বর দিয়ে দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হয়েছে। এরপর আর বাকি প্লটগুলোর দলিল নিবন্ধন হয়নি। প্রকৃতপক্ষে প্লটগুলো আরডিএ তাদের নামে অধিগ্রহণ করতে পারেনি। কারণ এই প্লটগুলোর মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (হাউজিং)। অন্য সংস্থার জমি অধিগ্রহণ না করেই আরডিএ এসব প্লট বরাদ্দ দিয়েছিল। আবার প্লট নম্বর পরিবর্তন করে ভুয়া প্লটের দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হয়েছে। এখন আরডিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা নতুন করে প্রকৃত জমি আবার দলিল নিবন্ধন করে দেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী বলেন, তাঁর জমি দলিল নিবন্ধন করে নিতে ৫ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এখন আরডিএ বলছে, বর্তমান বাজারমূল্যে নতুন করে জমির দাম পরিশোধ করতে হবে। আগের দলিল নিবন্ধন বাতিল করে আবার দলিল নিবন্ধন করতে হবে। এটা কোনো আইনে পড়ে না। মেনে নেওয়াও যায় না। তিনি আরও বলেন, মহানন্দা বাণিজ্যিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের পাঁচটি প্লট নিয়ে একই সমস্যা হয়েছে। এই পাঁচটি প্লটের জমির মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের একটি প্লট একইভাবে ভুয়া দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে বনলতা বাণিজ্যিক এলাকা সম্প্রসারণ ও আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের ১৯৩টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চার বছর পার হয়ে গেলেও মালিকদের আজও প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। কিন্তু প্লট মালিকদের কাছ থেকে সব টাকা আদায় করা হয়েছে। এই আবাসিক এলাকার সম্প্রসারিত অংশে নতুন করে ৩১টি প্লট তৈরি করে সম্প্রতি এগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের সিংহভাগ প্লট আরডিএর চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি বারনই আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই আবাসিক এলাকায় ১৭০টি প্লট রয়েছে। গত ৩১ মে এই প্লট মালিকদের কাছ থেকে প্রথম কিস্তির টাকা জমা নেওয়ার শেষ তারিখ ছিল। কিন্তু মূল জমির মালিকদের কাছ থেকে এই জমি অধিগ্রহণই করা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, অন্যের মালিকানাধীন জমি আরডিএ বেআইনিভাবে বরাদ্দ দিয়ে টাকা নিয়েছে।
শুধু তাই নয়, পদ্মা আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প আরডিএর সবচেয়ে পুরোনো প্রকল্প। এই প্রকল্পের কিছু কিছু প্লটে এখনো সমস্যা রয়েছে। কিছু প্লট সরকারি রাস্তার (ডহর) মধ্যে পড়েছে। সেগুলো এখন খারিজ করা যাচ্ছে না। এই প্রতিবেদন লেখার সময় আরডিএর চেয়ারম্যানসহ ছয়জন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বিদেশ সফরে ছিলেন। জানতে চাইলে আরডিএর ভূ-সম্পত্তি (এস্টেট) কর্মকর্তাবদরুজ্জামান ভুয়া দলিল নিবন্ধনের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আগে এগুলো হয়েছে। ভুলবশত হয়েছে না কীভাবে হয়েছে তিনি বলতে পারবেন না। এখন চেষ্টা করা হচ্ছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জমির মালিকানা হস্তান্তর করে নতুন করে দলিল নিবন্ধন করে দেওয়ার। অতিরিক্ত নিবন্ধন খরচ কে দেবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ কথা কাকে বলবেন আর কে শুনবে তা তিনি বলতে পারবেন না।
বদরুজ্জামান আরও বলেন, বনলতা আবাসিক এলাকার প্লট ঈদের পরেই খারিজ হয়ে যাবে। ঈদের পরেই মালিকদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। প্লট বরাদ্দে অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে লটারির মাধ্যমে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অধিগ্রহণ না করেই বারনই আবাসিক প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণ করতে অনেক সময় লাগবে। তাতে ভূমির মালিকদের (যাঁদের জমি নিয়ে আবাসিক এলাকা করা হয়েছে ) টাকা পেতে দেরি হবে। তাঁদের সুবিধার জন্যই এটা করা হয়েছে।