এক বছরে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ১৬১ শতাংশ

সূত্র: বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম
সূত্র: বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম

দেশের শিশুদের অবস্থা দিনে দিনে নাজুক থেকে নাজুকতর হচ্ছে। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ধর্ষণ বেড়েছে ১৬১ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে গত বছরের প্রথম চার মাসের চেয়ে ধর্ষণ বেড়েছে ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের শিশু অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত বছর থেকে চলতি বছরের প্রথম চার মাস অর্থাৎ গত ১৬ মাসে শিক্ষকের হাতে শাস্তি, চুরির অপবাদে দরিদ্র ও শ্রমজীবী শিশুদের পিটিয়ে নির্যাতনসহ অন্যান্য নির্যাতনও বেড়েছে। ১০টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করে ফোরাম এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
২৬৭টি এনজিওর জাতীয় মোর্চা শিশু অধিকার ফোরাম তাদের প্রতিবেদনে শিশুর প্রতি নির্যাতনের মাত্রা কোথায় বেড়েছে, কোথায় কমেছে তারও কিছু হিসাব দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের শেষের দিকে চাঞ্চল্যকর রাজন-রাকিবসহ বেশ কিছু শিশু হত্যার দ্রুত বিচার হয়। ফলে ২০১৪ সালের তুলনায় গত বছর শিশু হত্যা ২০ শতাংশ কমেছে। তবে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে গত বছরের প্রথম চার মাসের তুলনায় শিশু হত্যা বেড়েছে ২ শতাংশ। প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বিচারহীনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বলা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন আমরা প্রত্যক্ষ করি না। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক অপরাধ হচ্ছে, কিন্তু অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনকে সেভাবে প্রয়োগ করতে দেখছি না। আইনের শাসন দুর্বল থাকলে ধর্ষণসহ অন্যান্য উপসর্গ, উপদ্রব চলতেই থাকবে।’
শিশু অধিকার ফোরামের প্রতিবেদন বলছে, গত ১৬ মাসে (জানুয়ারি, ২০১৫ থেকে এপ্রিল ২০১৬) ৩০টির মতো শিশু হত্যা মামলার রায় হয়েছে। রাজন, রাকিব ও আবু সাঈদ ছাড়া বাকি সব হত্যার ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ থেকে ২০১৪ সময়ে। বাংলাদেশ পুলিশের তৈরি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৬ মাসে ২৭ হাজার ৪৩৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অধিকাংশ ঘটনা বিচারের অপেক্ষায়।
যৌন নির্যাতন: প্রতিবেদনটি বলছে, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন বেড়েছে ২২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর গত বছর ৫২১টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ৯৯টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়। ৩০টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার চারটি শিশু আত্মহত্যা করে। ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার ১৯৯টি শিশুর মধ্যে ২২টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল।
হত্যা: গত বছরের আলোচিত বিষয় ছিল শিশু হত্যা। হত্যার শিকার হয় ২৯২টি শিশু। বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে ৪০টি শিশু খুনের অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে ২০১৪ সালে ৩৬৬টি শিশু হত্যার শিকার হয়। অর্থাৎ, গত বছর শিশু হত্যা কমে ২০ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৯৫টি শিশু খুন হয়েছে। 

রাজনৈতিক সহিংসতা: গত বছর ১০১টি শিশু রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি শিশু নিহত হয়। আহত হয় ৭৬টি শিশু। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে গত বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এই চার মাসে।
অন্যান্য নির্যাতন: পারিবারিক কলহ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হওয়া, প্রেম-ভালোবাসায় ব্যর্থ হওয়া এবং কোনো শৌখিন জিনিস কিনে না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে গত বছর ২২৮টি শিশু আত্মহত্যা করে, যা এর আগের বছরের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি। ২০১৪ সালের চেয়ে গত বছর অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধি পায় ১০ শতাংশ। তবে অপহরণের পর উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে ৮২ শতাংশ। অপহরণের পর শিশু হত্যা কমেছে ২৩ শতাংশ।
২০১৪ সালের চেয়ে গত বছর শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ে (৭০ শতাংশ)। গত বছর ১৩৬টি শিশু নিখোঁজ হয়।
গত বছর ২৪টি অজ্ঞাতপরিচয় নবজাতককে কুড়িয়ে পাওয়া যায়, যাদের জন্মের পরেই রাস্তা, ডাস্টবিন বা ঝোপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় ৫২টি শিশুর লাশ পাওয়া যায়, যার ৯৮ শতাংশই ছিল নবজাতক। গত বছর ৪৫১টি শিশু বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়। এর মধ্যে ২১৯টি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ১৬৬টি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হয়।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি নারী ও শিশু নির্যাতনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক শাস্তির পরিমাণ আগের তুলনায় খানিকটা কমে এসেছে। আগে অভিভাবকেরাও শিক্ষকদের বলে দিতেন, পড়া না পারলে শাস্তি দিলে ক্ষতি নেই। এখন অভিভাবকেরা সচেতন। ঘটনা ঘটলে গণমাধ্যমও ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তিনি শিশুর মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতন বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনসহ বেশ কিছু নির্যাতন প্রতিরোধে বাবা-মায়ের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। হত্যা, ধর্ষণসহ শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি রায় দ্রুতগতিতে কার্যকর করারও সুপারিশ করা হয়েছে। গণমাধ্যমে শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ফলোআপ প্রকাশ করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের বিষয়টি নিয়ে ঢাকা, সাতক্ষীরা ও শ্রীমঙ্গল চা-বাগানে কাজ করছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানাও মনে করেন, বাবা-মাসহ শিশু যার তত্ত্বাবধানে থাকবে, সেই ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ সচেতন হলে যৌন নির্যাতনসহ অনেক নির্যাতন কমানো সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশ কয়েকটি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটার পর গণমাধ্যমে তোলপাড় হয়। শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। সচেতনতা তৈরির ফলে শিশুরাও ঘটনা ঘটলে চিৎকার করে বা বলে দেয়। অভিভাবকেরাও চুপ থাকছেন না। ফলে বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের সংখ্যা কমে এসেছে।