কোকেন চোরাচালানের রুট হিসেবে এখন বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কলম্বিয়া, বলিভিয়া, মেক্সিকো, পেরুসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকেই সাধারণত উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে কোকেনের চালান যায়।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ থেকে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডের মতো দেশ হয়ে তা আবার উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের দেশে যায়। বাংলাদেশে কোকেনের তেমন বাজার নেই। এখানে নেশাদ্রব্য হিসেবে কোকেনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এ দেশে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা—এসব অপেক্ষাকৃত কম দামের মাদকের ব্যবহার বেশি।
চট্টগ্রাম বন্দরে ধরা পড়া ভোজ্যতেলের মধ্যে তরল কোকেনের রুটটিও এমনই বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। এ মাসের শুরুতে বলিভিয়া থেকে ১০৭ ড্রাম সূর্যমুখী ভোজ্যতেলের চালান চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এ চালানটি উরুগুয়ের মন্টিভিডিও থেকে জাহাজীকরণ করা হয়। পরে তা সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ৮ জুন শুল্ক গোয়েন্দারা এ চালানটি আটক করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে কোকেনের অস্তিত্ব পায়।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশ এর আগে কখনোই সূর্যমুখী ভোজ্যতেল আমদানি করেনি। আর এ ভোজ্যতেল এসেছে ঋণপত্র (এলসি) না খুলেই। অর্থাৎ, এ চালানটি অন্য কোনো পণ্যের চালানের সঙ্গে এসেছে। শুল্ক গোয়েন্দারা সন্দেহ করছে, কোকেনের চালানটি উত্তর আমেরিকা কিংবা পশ্চিম ইউরোপের দেশে পুনরায় রপ্তানি করা হতে পারে। বাংলাদেশ হয়ে এ পথটি হতে পারে সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া হয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য।
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সরাসরি আসা যেকোনো পণ্যের চালানই অত্যন্ত কঠোরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশের শুল্ক কর্তৃপক্ষ। তিন মাসে আগে বলিভিয়া থেকে সূর্যমুখী ভোজ্যতেলের একটি চালান থেকে ৩১৫ কেজি কোকেন আটক করেছে কানাডীয় পুলিশ।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, কোকেনের এ চালানটির গন্তব্য বাংলাদেশ নয়, এর পেছনে আরেকটি কারণ কাজ করছে। সেটি হলো তরল কোকেনকে গুঁড়া বা পাউডার কোকেনে রূপান্তর করার মতো প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে নেই।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মঈনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে কোকেনের ব্যবহার নেই। এ চালানটি হয়তো বাংলাদেশের জন্য আসেনি।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) সভাপতি বিশিষ্ট চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এ নেশা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় বাংলাদেশে এর ব্যবহার একদমই নেই। ধরা পড়া কোকেন বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। বাংলাদেশ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পশ্চিম ইউরোপের মতো উন্নত দেশে এর ব্যবহার বেশি।
কোকেন কী ও দাম কত: ইরাইথ্রোজাইল্যাসিয়া গোত্রের উদ্ভিদ বা কোকো গাছের পাতা থেকে কোকেন হয়। মূলত এ পাতাকে প্রক্রিয়াজাত করে পাউডারের মতো করা হয়, যা কোকেন মাদক হিসেবে পরিচিত। ধূমপান, নস্যি ও ইনজেকশন—এই তিনভাবে কোকেন নেওয়া হয়।
কোকেন নিলে প্রাথমিকভাবে শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের প্রভাব ফেলে। বিশিষ্ট চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে কোকেন নিলে যকৃৎ ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হয়। আর একবার কোকেন নিলে আমৃত্যু তা নিতে হয়।
মাদক হিসেবে কোকেন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতি কেজি কোকেনের দাম কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থার (ইউএনওডিসি) ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০১৪ অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের হিসাবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর ৬০ হাজার ৪০০ হেক্টর পরিমাণ জমিতে কোকেন চাষ হয়। আর কলম্বিয়ায় ৪০ হাজার হেক্টর ও বলিভিয়ায় ২৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে কোকেন চাষ হয়। এ অঞ্চলের মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। কোকেন চোরাচালানের প্রচলিত রুট হলো দক্ষিণ আমেরিকা থেকে পশ্চিম আফ্রিকায় হয়ে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ। গত কয়েক বছর ধরে কোকেন চোরাচালানের রুট হিসেবে এশিয়াকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।