ক্যাসিনো-কাণ্ডে ক্লাবপাড়ায় হতাশা, তালা খুলবে কবে

জুয়া ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর থেকে রাজধানীর মতিঝিলের ক্লাবগুলোর প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ফুটবলে দলবদল চললেও ক্লাবের সামনে সংশ্লিষ্ট লোকজন তেমন দেখা যাচ্ছে না। গতকাল বিকেলে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে। ছবি: প্রথম আলো
জুয়া ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর থেকে রাজধানীর মতিঝিলের ক্লাবগুলোর প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ফুটবলে দলবদল চললেও ক্লাবের সামনে সংশ্লিষ্ট লোকজন তেমন দেখা যাচ্ছে না। গতকাল বিকেলে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে।  ছবি: প্রথম আলো

মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের মূল ফটক থেকে একটু বাঁয়ে কারুকাজখচিত একটি ফটক। তালাবদ্ধ ফটকটি পেরোলেই ক্যাসিনো ঘর। দেড় বছর ধরে চলা এই ক্যাসিনোর কারণে ক্লাবের ৮৩ বছরের ঐতিহ্য ও সুনামে চিড় ধরেছে। একই অবস্থা ঐতিহ্যবাহী অন্য ক্লাবগুলোরও।

ঘুরেফিরে এখন প্রশ্ন অনেক। ক্লাবগুলো কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? খেলোয়াড় আর খেলা-সংশ্লিষ্ট মানুষগুলো কোথায় যাবেন? যাঁরা ক্লাবে ক্যাসিনো চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবেন?

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনো খুঁজে পায় র‍্যাব। জানা যায়, ঢাকার সাতটি ক্লাবে ক্যাসিনো চলছে। এরপরই অভিযান চালিয়ে বেশ কটি ক্লাবে তালা ঝুলিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ধানমন্ডি, আরামবাগ ও মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার মানুষের মনে এখন হতাশা আর আশঙ্কা। প্রথম বিভাগ ক্রিকেটের দলবদল ২ অক্টোবর শেষ হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে দলবদল শুরু হয়েছে। আগামী এক বছরের জন্য খেলোয়াড়দের ক্লাবগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু দলগুলো আবার কবে খেলাধুলার অনুশীলনে ফিরতে পারবে, ক্লাবপাড়া আড্ডা-গল্পে জমজমাট হয়ে উঠবে কি না, সে কথা কেউ বলতে পারছেন না। কলাবাগান ক্রীড়াচক্র, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে গিয়ে মনে হয়েছে ক্লাব দুটি দুর্নাম ঘুচিয়ে খেলায় ফেরার চেষ্টা করছে। ফকিরাপুল ইয়ংমেনস, ওয়ান্ডারার্স, আরামবাগ, ভিক্টোরিয়া, দিলকুশার ফটকে এখনো তালা। কবে এই তালা খুলবে, কেউ বলতে পারছেন না।

ক্লাবগুলোর সঙ্গে জড়িত সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং সংগঠকেরা তাকিয়ে আছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) দিকে। কিন্তু বাফুফে ও বিসিবির কাছ থেকে তাঁরা সে অর্থে সাড়া পাননি।

গত মঙ্গলবার দুপুরের দিকে দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুর হাত ধরে মায়েরা ঢুকছিলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। ওরা ক্রিকেট কোচিং করে। কুইন বেগম নামের একজন অভিভাবক প্রথম আলোকে বললেন, ক্যাসিনোয় অভিযান চালানোর পর তাঁর মধ্যে ছেলেকে পাঠানো নিয়ে একটু অস্বস্তি ছিল। ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন খেলা-সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে এসবের কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁরা যেন সন্তানদের পাঠান। এরপরই ছেলেকে নিয়ে আসেন। পেশায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা এক অভিভাবক জানান, ক্যাসিনো-কাণ্ডের সঙ্গে মোহামেডান ক্লাবের নাম জড়িয়ে পড়ায় কষ্ট পেয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন ছেলেকে কোচিংয়ে পাঠাননি। অনেকে এখনো আস্থার সংকটে ভুগছেন।

আস্থার সংকট কতটা গভীর, তার আভাস পাওয়া গেল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল দলের কোচ ইব্রাহীম কালার সঙ্গে কথা বলে। এই ক্লাবের সঙ্গে তাঁর তিন দশকের সম্পর্ক। তিনি বলছিলেন, একসময়ের সেরা খেলোয়াড় কানন, কায়সার হামিদ, সাব্বিরসহ অনেকে গত সোমবার ক্লাবে আসেন। ক্লাবের এই দুঃসময়ে কীভাবে কী করা যায়, তা নিয়ে তাঁরা দীর্ঘ আলোচনা করেন। এর আগে তাঁরা সংবাদ সম্মেলনও করেন। একসময়ের জনপ্রিয় খেলোয়াড় সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বির প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্লাবের এমন সংকটের সময় আমরা কীভাবে বসে থাকি? সামনে প্রিমিয়ার লিগের খেলা। অনেক টাকার প্রয়োজন। এখন যে অবস্থা, কেউ তো টাকাপয়সাও দিতে চাইবেন না।’

ক্লাবের ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো বলছে, মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো চলছে সোয়া বছরের মতো। তাঁরা যতটুকু জানেন, ক্লাব কর্তৃপক্ষ ক্যাসিনো ভাড়া দিতে চায়নি। ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও এলাকার কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদের লোকজন তাদের বাধ্য করেছেন। তাঁরা প্রথমে খেলোয়াড়দের থাকার জায়গাটা নিতে চেয়েছিলেন। মাপজোখও করে যান। পরে ক্লাব কর্তৃপক্ষ অনুনয়-বিনয় করেই ওই জায়গাটা রক্ষা করে। ক্লাবের উল্টো পাশের মনিহারি দোকান আছে মোহামেডানের এক কর্মীর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ক্যাসিনোয় ক্লাবের কর্মীদেরও ঢোকা বারণ ছিল। তাঁদের প্রশ্ন, ক্লাবের জায়গা ভাড়া দেওয়ার জন্য যদি লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার হতে হয়, তাহলে যাঁরা ক্লাবের জায়গা ভাড়া নিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?

আরামবাগ ক্রীড়া সংঘেও তালা ঝুলছে। এই ক্লাবও ফুটবলে প্রিমিয়ার লিগে খেলে। তারাও সমস্যায় পড়েছে।

কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের অভিযোগ আরও গুরুতর। এই ক্লাব ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেট খেলে। ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ আইনজীবী খাতিব আহমেদ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, কলাবাগান ক্লাবে ২০১৫ সালে ক্যাসিনো শুরু হয়েছিল। সাত মাস পর স্থানীয় সাংসদ ফজলে নূর তাপস ও ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলমের উদ্যোগে ক্যাসিনো বন্ধ হয়ে যায়। যাঁরা ক্যাসিনো চালাতেন, তাঁদের দিক থেকে আবারও ক্যাসিনো চালুর জন্য চাপ ছিল। এর মধ্যেই শফিকুল গ্রেপ্তার হন। ক্লাবের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকাপয়সা তুলতে শফিকুল ও তাঁর (খাতিব আহমেদ) সই লাগে। তাঁরা টাকা তুলতে পারছেন না। প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে দল গঠনের কাজ চলছিল। টাকার অভাবে এর মধ্যেই চারজন খেলোয়াড় হাতছাড়া হয়ে গেছেন। ক্লাবের লোকজন নিজেরা চাঁদা তুলে এখন দল গঠনের চেষ্টা করছেন। এই দুঃসময়ে বিসিবিকেও তাঁরা পাশে পাচ্ছেন না।

বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দীন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি দলকে বছরের বিভিন্ন সময় ছয় লাখ টাকা দেয় বিসিবি। এবার পরিস্থিতি অন্য রকম। তাই বোর্ড এককালীন ছয় লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভিক্টোরিয়া, দিলকুশার মতো দলগুলোর ফুটবল খেলা শুরু হতে এখনো তিন-চার মাস বাকি। খেলা-সংশ্লিষ্ট লোকজন বলছেন, এ সময়টায় ক্লাবগুলোয় কমিটি বসে পরিকল্পনা করে, কোচিং চলে ও নতুন খেলোয়াড় তৈরির কাজ করে। সব কাজ বন্ধ।

ক্লাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিপদে
ক্লাবগুলো বন্ধ থাকায় ক্লাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিপদে পড়েছেন। সূত্রগুলো বলছে, ক্যাসিনো পরিচালনায় ক্লাবের লোকজন বা খেলোয়াড়দের সম্পৃক্ততা ছিল না। ক্লাব শুধু টাকা পেত। অভিযানের পর ক্লাব বন্ধ থাকায় কর্মীরা বেতন পাচ্ছেন না।

এখন ক্রিকেট-ফুটবলের দলবদলের মৌসুম। কিন্তু ক্লাবপাড়া বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক অনুশীলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবের কর্মী মনির হোসেন ১৫ হাজার টাকা বেতনে খেলোয়াড়দের জন্য বাজার-সদাই করার কাজ করতেন। ক্লাব বন্ধ থাকায় কুমিল্লার দেবীদ্বারে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন তিনি। কবে বেতন পাবেন জানেন না। তিনি বলেন, ক্লাবের কর্মচারী ও ক্যাসিনোর কর্মচারী আলাদা। অভিযানের দিন তাঁর ছোট ভাই রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আল আমিন এসেছিলেন তাঁর কাছ থেকে টাকা নিতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন তাঁকেও ধরে নিয়ে গেছে।

মঙ্গলবার ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পাশের একটি চাতালে তিন পুলিশ সদস্যকে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। তাঁদের একজন মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক নূর আলম। ক্লাবগুলোর অবস্থা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি যেমন দেখছেন, আমিও দেখছি। তালা ঝুলছে। কবে খুলবে জানি না।’

ক্লাবগুলোর ফটকে তালা ঝুললেও এক দোকানি বললেন, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। এসব ক্লাবের কারণে শত শত মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছেন। সংসার ভেঙে গেছে।

তাহলে ফুটবল-ক্রিকেট-হকি নিয়ে ক্লাবগুলো যে একসময় গমগম করত, সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে? আরামবাগে দাপ্তরিক জিনিসপত্র বিক্রির একটি দোকানের কর্ণধার সাবেক প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ক্যাসিনো তো চালিয়েছেন গুটি কয়েক লোক। তার জন্য ক্লাবে দিনের পর দিন তালা মেরে রাখাটা ঠিক না। খেলোয়াড়েরা তাহলে যাবেন কোথায়?

সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও ফুটবল সংগঠক আনোয়ারুল হক হেলাল প্রথম আলোকে বলেন, এই সমস্যা সমষ্টিগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। একজন-দুজনের হাতে ক্লাবের সমস্যা মেটানোর দায়িত্ব দিলে চলবে না। এসব সমস্যা ক্লাবগুলোতে সংস্কারের একটা সুযোগও তৈরি করল। খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত যাঁরা—খেলোয়াড়, ক্লাব সদস্য, সংগঠক ও শুভানুধ্যায়ী, যাঁরা ক্লাবগুলোয় অনুদান দিতেন, তাঁদের সবাইকে ফিরিয়ে আনা দরকার। তাহলেই ক্লাবগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।