
পাশাপাশি তিনটি গ্রাম। প্রথমে তিনটিলা, এরপর বাত্যাপাড়া। মাঝখানে একটি বিল। এই বিল পেরোলে মানিকজোড়ছড়া গ্রাম। রাঙামাটির লংগদু উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে পশ্চিম দিকে ইটের রাস্তা ধরে আধা কিলোমিটার পথ পেরোলে প্রথমে পড়বে সবুজে ঘেরা তিনটিলা গ্রাম। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে দুটি পোড়া ঘর। দেখে মনে হয় টিনের তৈরি ছোট ঘর দুটি হয়তো দোকান ছিল।
পোড়া দুটি দোকান পেরোলে হাতের বাঁয়ে গ্রামের ভেতরে ইটের রাস্তা চলে গেছে। এই রাস্তা ধরে একটু এগোতেই পরপর চারটি পোড়াবাড়ি চোখে পড়ে। বাড়িগুলোর সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পোড়া টিনের টুকরা, কাঠের কয়লা, মেলামিন ও টিনের ভাঙা থালাবাসন, গ্লাস। গ্রামের ভেতরের দিকের অবস্থা আরও ভয়াবহ। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ছাড়া গ্রামের বেশির ভাগ বাড়ির কোনোটি সম্পূর্ণ, কোনোটি আংশিক পোড়া। এ ছাড়া ভাঙচুর করা বেশ কিছু বাড়িও চোখে পড়ে। পোড়াবাড়িগুলোর সামনে পড়ে আছে টিন, আসবাবসহ ব্যবহার্য সামগ্রী। পুরো গ্রাম প্রাণহীন, নিস্তব্ধ।
৫ জুলাই সকালে প্রথম আলোর দুই প্রতিবেদক এবং একজন ফটোসাংবাদিক প্রায় দেড় ঘণ্টা তিনটিলা গ্রাম ঘুরে স্থানীয় কোনো বাসিন্দার দেখা পাননি। এর আগে গত ২ জুন স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনটিলাসহ লংগদুর ওই তিনটি পাহাড়ি গ্রামে আগুনে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় আতঙ্কে এসব গ্রামের শতাধিক পাহাড়ি পরিবার পালিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের ভূঁইয়াছড়া, মধ্যমপাড়া, রাঙাপানিছড়া ও হারিহাবা এলাকার বনে, পরিত্যক্ত ঘরে ও গাছতলায় আশ্রয় নেয়। এমনকি মানিকজোড়ছড়ার পাশে গ্রাম বড়াদমের লোকজনও ভয়ে পালিয়ে যান।
নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় ঘটনার এক মাস পরও ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি গ্রামের বাসিন্দারা এখনো নিজ নিজ বাড়িতে ফেরেননি। তাঁরা লংগদু সদরসহ বিভিন্ন এলাকার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও নিজেদের তৈরি শিবিরে বাস করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনটিলা গ্রামে দেড় শতাধিক বাড়ি ছিল। এর মধ্যে ৯৪টিই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আংশিক পুড়ে গেছে ও ভাঙচুর করা হয়েছে আরও ৪৩টি বাড়ি। তিন গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন তিনটিলার বাসিন্দারা। এ ছাড়া বাকি দুটি গ্রামের ১২৯টি বাড়ি ও দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
হামলার শিকার পাহাড়িরা সরকারি কোনো ত্রাণ বা পুনর্বাসন সহায়তা নিচ্ছেন না। সাধ্যমতো সহায়তা নিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও মানবাধিকার সংগঠন। সরকারি সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে পাহাড়িদের শর্ত, আগে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার করার দাবি জানান তাঁরা। এরপর তাঁদের ক্ষতিপূরণ ও রেশন দিতে হবে।
পাহাড়িদের অভিযোগ, গত ২ জুনের ওই হামলায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নেতা-কর্মীসহ বাঙালিদের (স্থানীয়ভাবে সেটেলার নামে পরিচিত) নানা সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা জড়িত। হামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা ছিল বলেও পাহাড়িদের অভিযোগ। এই অভিযোগের যৌক্তিকতা কী—জানতে চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা বলেন, হামলার আগে প্রশাসনকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো হয়েছিল। তখন তারা বলেছিল, হামলা হবে না। তারা নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু পরে দেখা যায়
তাদের সামনেই হামলাকারীরা ঘরে আগুন দিয়েছে। লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তখন একজনকেও আটক করেনি। আগুন নেভানোরও চেষ্টা করেনি। বরং পাহাড়িরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে তাঁদের হটিয়ে দিয়ে হামলাকারীদের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
৫ জুলাই লংগদু সদরের তিনটিলা বনবিহারে আশ্রয় নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন লংগদু সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) কুলিন মিত্র চাকমা, আটারকছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মঙ্গল কান্তি চাকমা, তিনটিলা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত মণিশংকর চাকমা প্রমুখ। ওই হামলায় তাঁদের সবার বাড়িঘরসহ মোট ২২৩টি বাড়িঘর (তিন গ্রামের) পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কুলিন মিত্র চাকমার ঘরে আশ্রয় নেওয়া বৃদ্ধা গুন মালা চাকমা সেখানেই পুড়ে মারা যান বলে জানান তিনি। পুড়িয়ে দেওয়া তিনটি গ্রাম লংগদু সদর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।
এর আগে ১৯৮৯ সালের ৪ মে লংগদুতে পাহাড়িদের ওপর একই ধরনের হামলা হয়েছিল। তখন ৩২ জন পাহাড়ি নিহত হন। নয়টি গ্রামের ১ হাজার ১১টি বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে পাহাড়ে বাঙালি সেটেলার বসানোর প্রক্রিয়ায় লংগদু উপজেলায় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাঙালিকে পুনর্বাসিত করা হয়। এই উপজেলায় প্রায় এক লাখ বাঙালি সেটেলারের বসবাস বলে পাহাড়িরা জানান।
গত ২ জুনের হামলার ঘটনার আগের রাত থেকেই এলাকার পরিস্থিতি থমথমে ছিল। ১ জুন খাগড়াছড়ি সদরের চারমাইল এলাকায় রাস্তার পাশের জঙ্গল থেকে লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নুরুল ইসলামের (নয়ন) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ভাড়ায় মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করতেন তিনি। সেদিন সকালে মোটরসাইকেলে দুজন যাত্রী নিয়ে তিনি লংগদু থেকে খাগড়াছড়ি যাচ্ছিলেন। বাঙালিদের অভিযোগ, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনার সঙ্গে পাহাড়ি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত।
২ জুন হামলার ঘটনার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন সকাল থেকে লংগদু সদরের আশপাশের এলাকা এবং দূরবর্তী মাইনি, গাদোছড়া, বগাচতর এলাকা থেকে গাড়ি ও নৌকায় করে শত শত বাঙালি নিহত নুরুল ইসলামের বাড়ি বাত্যাপাড়া গ্রামে সমবেত হতে থাকেন। বেলা ১১টায় জানাজার সময় দেওয়া হলেও সাড়ে নয়টার দিকেই তাঁরা গ্রামে মিছিল বের করে এবং পাহাড়িদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে দিতে লংগদু সদরের দিকে এগোতে থাকেন। বাত্যাপাড়া থেকে তিনটিলা গ্রাম হয়ে উপজেলা সদরের দূরত্ব এক কিলোমিটার।
মিছিলের সামনে একাধিক ব্যানারে লেখা ছিল ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী কর্তৃক মোটরসাইকেল চালক নয়ন হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা’। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লংগদু উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র বলেছে, এই ব্যানারগুলো এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোকের নির্ধারিত সময়ের আগেই মিছিল শুরু করার ঘটনা প্রমাণ করে হামলা পূর্বপরিকল্পিত। না হলে এসব প্রস্তুতি নেওয়া হতো না।
উপজেলা পরিষদের সামনের মাঠে অনুষ্ঠিত ২ জুন বেলা ১১টার ওই সভায় বক্তব্য দেন লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোমিনুল ইসলামসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাঁদের বক্তব্য যখন চলছিল, তখন কিছু বাঙালি তিনটিলা গ্রামে পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছিলেন।