নাম নুরুল ইসলাম। বাড়ি নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার গড়মাটি দক্ষিণপাড়ায়। পরিচয় দেন ‘সাপুড়ে কবিরাজ’ বলে। এলাকাবাসী জানেন, তিনি বিষধর সাপের সংগ্রাহক ও বিক্রেতা। জ্যান্ত সাপ বিক্রি করেন। একই সঙ্গে সাপ মেরে পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি নানা রোগের ‘ওষুধ’ বলেও বিক্রি করেন। এটাই তাঁর পেশা। অথচ এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
গড়মাটি দক্ষিণপাড়া গ্রামের মানুষের তথ্যমতে, তিন-চার বছর ধরে নুরুল ইসলাম এই সাপের ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। এ নিয়ে একটি প্রচারপত্র রয়েছে তাঁর। সেখানে সাপের বিষ দিয়ে তৈরি ‘ওষুধ’ বিক্রি করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। নুরুল ইসলামের বাড়িতে শতাধিক বাক্সে এসব বিষধর সাপ রাখা হয়। নানা জাতের হাজার দেড়েক সাপ বাক্সে ভরে রেখেছেন তিনি। ডেকচি ও প্লাস্টিকের বালতিতে অনেক সাপের বাচ্চা রয়েছে। নুরুল ইসলাম প্রতিদিন ১০-১৫টি সাপ কেটে ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করেন। এ সময় উৎকট গন্ধ বের হয়। আশপাশের মানুষ তখন টের পান, নুরুল ইসলামের বাড়িতে কী হচ্ছে। তাঁর তৈরি ‘ওষুধ’ কিনতে শহর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে লোকজন আসেন।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, এসব মানুষ নুরুল ইসলামের কাছ থেকে সাপ কিনে বাক্সে ভরে নিয়ে যান। প্রতিবেশীদের দাবি, এর প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হয়নি। বাড়িতে সাপ ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখান নুরুল ইসলাম। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানিয়েও কোনো ফল হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুরুতে নুরুল ইসলামের সাপ সংগ্রহের প্রধান উৎস ছিল নাটোর জেলার চলনবিল। সেখান থেকে তিনি নিজেই সাপ সংগ্রহ করতেন। এখন তাঁর নিয়োগ করা লোকজন বিভিন্ন এলাকা থেকে সাপ ধরে নিয়ে আসেন। তাঁর কাছে এসব সাপ বিক্রি করেন তাঁরা। আশপাশের জেলা থেকেও অনেকে তাঁর কাছে সাপ এনে বিক্রি করেন।
সম্প্রতি নুরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সামনেই একটা সাইনবোর্ড। এতে লেখা রয়েছে—‘যেখানে সাপ দেখবেন, আমার সাথে যোগাযোগ করবেন’। তবে তাঁর দেখা মেলেনি।
প্রবেশমুখে তাঁর স্ত্রী মুঠোফোনে স্বামীর কাছে আগন্তুক সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। পরে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি মেলে। বাড়ির ভেতর দেখা গেল, ছোট-বড় শতাধিক বাক্স সাজানো।
প্রতিটি বাক্সে জ্যান্ত সাপ। রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হলো ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া দেখাতে। চুলার ওপর পাতিলে আস্ত বিষধর সাপ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। এ সময় উৎকট গন্ধে টেকা যাচ্ছিল না।
নুরুল ইসলামের স্ত্রীর ভাষ্য, তাঁরা সাপের বিষ দিয়ে ‘ওষুধ’ তৈরি করেন। তবে হাট-বাজারে বিক্রি করতে যান না। লোকজন বাড়িতে এসে ওষুধ নিয়ে যান। এই ‘ওষুধে’ রোগ ভালো হয় কি না, তা তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে অপরিচিত লোকজন আসেন। তাঁরা জীবিত সাপ কিনে নিয়ে যান। কয়েক মাস আগে একসঙ্গে ৬০০টি বিষধর সাপ বিক্রি করেছেন তাঁরা।
গ্রামের রিকশা–ভ্যানচালক উজ্জ্বল হোসেন বলেন, নুরুল কবিরাজ সাপ ধরায় খুব দক্ষ। সাপ জ্বাল দেওয়ার সময় যে বিচ্ছিরি গন্ধ হয়, এতে আশপাশের লোকজনের সমস্যা হয়। তাঁর সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির সুসম্পর্ক থাকায় গ্রামের লোকজন মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছেন।
পরবর্তী সময়ে নুরুল ইসলামের বাড়িতে গেলে তাঁর দেখা মেলে। এ সময় নুরুল ইসলাম জানান, তিনি সাপের বাচ্চা বড় করে বিক্রি করেন। আবার কিছু সাপ দিয়ে ওষুধ বানান। এভাবে সাপ নিধন করে তিনি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার মতো কোনো অপরাধ করছেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করছি বলে মনে হয় না। মানুষকে নিরাপদ করতেই বিষধর সাপ ধরে এনে কাজে লাগাচ্ছি।’
একটি প্রচারপত্র এই প্রতিনিধির হাতে ধরিয়ে দিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘দেখেন, আমি ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদন নিয়েই কাজ করছি।’ প্রচারপত্রে ‘ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত’ বাক্যটি লেখা রয়েছে।
স্থানীয় গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আবুবকর সিদ্দিক বলেন, নুরুল ইসলামকে এ ধরনের ব্যবসা করার অনুমোদন তিনি দেননি। নুরুল ইসলাম তাঁর বাড়িতে সাপ নিয়ে কী করেন, তা-ও তিনি জানেন না।
এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী এভাবে সাপ সংগ্রহ ও মেরে ফেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।
বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, এ ব্যাপারে কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো পাইনি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। বিষয়টি জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’