নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর নরসিংহপুর জলমহালে প্রভাবশালীদের নিয়োজিত জেলেরা মাছ ধরছেন
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর নরসিংহপুর জলমহালে প্রভাবশালীদের নিয়োজিত জেলেরা মাছ ধরছেন

সরেজমিন—২, নেত্রকোনা

হাওরে ‘ক্ষমতা যাঁর জলা তাঁর’

মৎস্যজীবী সমিতির নামে জলমহাল ইজারা। নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। সাধারণ জেলেরা মাছ ধরার সুযোগ পান না।

নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের ৩০০ মিটার পুবে নয়াপাড়া জেলেপাড়া। শেষ বিকেলে বাড়ির সামনে উঠানে বসে জাল বুনছেন সুশীল বর্মণ। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, হাওরে মাছ কেমন ধরা পড়ছে। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমাগো ফিশারিজ নেই। মাছ ধরি না। পাঙাশের ব্যবসা করি।’

হাওর হলো মাছের এলাকা। সেখানে কেন একজন জেলেকে পেশা পরিবর্তন করে চাষের মাছ বিক্রি করতে হচ্ছে জানতে চাই।Ñসুশীল বর্মণ সরাসরি উত্তর না দিয়ে ভাতিজা সুমন বর্মণের উদাহরণ দিয়ে বললেন, সুমন ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ডোবা পত্তন (জলমহালের ক্ষুদ্র একটি অংশ) নিয়ে মাছ ধরে। কিন্তু তাঁর (সুশীল) তো এত টাকা নেই। তিনি এ জন্য ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে পাঙাশ মাছ এনে বিক্রি করেন। ‘নিত্য আনি, নিত্য বেচি’ বললেন সুশীল।

কিন্তু ঢাকায় বসে যে হাওরের মাছের গল্প শোনা যায়, সেই মাছ তাহলে কোথায়? ‘ওই যে ফিশারিজে’—আলাপে যোগ দিয়ে বললেন সুমন বর্মণ। সুমন জানালেন, হাওরে বড় বোয়াল, রুই, কাতলা, আইড় ও চিতল ধরা পড়ছে। এগুলো প্রতিদিন নদীপথে ভৈরব হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।

সুশীল ও সুমন বর্মণ যাকে ‘ফিশারিজ’ বলছেন, তার পোশাকি নাম ‘জলমহাল’। খালিয়াজুরী উপজেলায় এ রকম জলমহাল আছে ৬৯টি। ২০ একরের বড় জলমহালগুলো তিন বছরের জন্য ইজারা দেয় জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি। আর ২০ একরের নিচের জলমহালগুলো একই সময়ের জন্য ইজারা দেয় উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি।

সরকারের জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০০৯–এ স্পষ্ট বলা আছে, ‘জাল যাঁর জলা তাঁর।’ কিন্তু খালিয়াজুরীতে একটা প্রবাদ চালু হয়েছে, ‘ক্ষমতা যাঁর জলা তাঁর।’

সম্প্রতি হাওরবেষ্টিত নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে জেলে ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলেন, হাওরে জীবিকার প্রধান উৎস ধান ও মাছ। কিন্তু তাঁদের মাছ ধরার উৎস দিন দিন কমে আসছে। হাওরের জলমহালগুলো ক্ষমতাবানদের দখলে যাচ্ছে।

জলমহালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, সাধারণত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর নামে জলমহাল ইজারা হয়। কিন্তু এর পেছনে থাকেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তাঁরাই মূলত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোকে ব্যবহার করেন। বিনিময়ে সমিতির দু–চারজন কিছু সুবিধা পান। প্রভাবশালীরা জলমহাল ইজারার বেশির ভাগ শর্ত মানেন না।

গাজীপুর ইউনিয়নের বড় জলমহাল ‘বেকীবিল’ ইজারা পেয়েছে দাউদপুর পশ্চিম মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। কিন্তু এই জলমহালের দখলদার উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও গাজীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান।

আতাউর রহমান কীভাবে জলমহালটির নিয়ন্ত্রক হলেন জানতে চাইলে দাউদপুর পশ্চিম মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, তারা তাঁকে (আতাউর) রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে আতাউর দাবি করেন, তাঁর শেয়ার আছে।

কথা বলে জানা গেল, এই রক্ষণাবেক্ষণকারীরাই মূলত জলমহালগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা কেউ জনপ্রতিনিধি, কেউ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের কয়েকজন বড় মৎস্য ব্যবসায়ীও আছেন এই তালিকায়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ও প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক সময় বড় জলমহালগুলো ইজারা দেয়। কাঁঠালজান বিলটি এর একটি। এই জলমহালের ইজারা পেয়েছে কৃষ্টপুর মৎস্যজীবী সমিতি। তবে এটাও রক্ষণাবেক্ষণের নামে নিয়ন্ত্রণ করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাাদক গোলাম আবু ইসাহাক, সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান সুমন চত্রবর্তী ও নেত্রকোনার কলমাকান্দার মৎস্য ব্যবসায়ী নারায়ণ চন্দ্র তালুকদার।

গোলাম আবু ইসাহাক বললেন, তাঁরা সমিতির সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করে বিনিয়োগ করেছেন। লভ্যাংশের নির্দিষ্ট একটি অংশ সমিতির সদস্যরাও পান। তবে সমিতির একজন সদস্য জানান, তাঁরা লভ্যাংশ নয়, দিনমজুরি পান।

খালিয়াজুরীর আরও দুটি বড় জলমহাল হলো নরসিংহপুর ও কীর্তনখোলা বিল। এই দুটি জলমহালেরর দখলদারও গোলাম আবু ইসাহাক ও সুমন চক্রবর্তী। তবে আবু ইসাহাক জানালেন, তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত আছেন।

মরাগাঙ জলমহালের দখলদার খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সানোয়ার জামান। গত ২২ ডিসেম্বর সকালে সেখানে কথা হয় জিয়াউর, সিদ্দিকুর ও আরও কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বললেন, তাঁরা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জলমহালের একটি ডোবা (ক্ষুদ্র একটি অংশ) এক লাখ টাকায় পত্তন নিয়েছেন। তাতে মাছ ধরছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চাকোয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতাই জলমহালের সঙ্গে জড়িত। তবে তাঁর দাবি, তিনি কোনো জলমহালের সঙ্গে জড়িত নন।

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, মৎস্যজীবী সমিতির নামে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি ৫০ একর আয়তনের জলমহাল ইজারা নেন, তাহলে ৫০০ একর দখল করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব বাহিনী আছে। তাঁরা জেলেদের উন্মুক্ত জায়গাতেও মাছ ধরতে বাধা দেন। নৌকা ভাঙচুর করেন।

হাওরের জলমহালগুলো প্রভাবশালীদের হাতে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেন খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম আরিফুল ইসলাম। তবে তিনি বলেন, হাওরে ইজারা দেওয়া জলমহালগুলো ছাড়াও উন্মুক্ত জলাশয় ও নদী আছে। সেগুলোতে জেলেরা মাছ ধরতে পারেন।

তবে এ সুযোগও কমে আসছে। খালিয়াজুরী সদর ইউপি সদস্য অজিত দাস বললেন, গত নভেম্বরে নয়াপাড়ার ছয়জন জেলে ধনু নদে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রভাবশালীদের বাইম মাছ ধরার একটি বাঁশের চোঙায় জেলেদের নৌকা লাগলে তাঁরা ছয় জেলেকে মারধর করেছেন। জেলেরা এখন মাছ ধরা ছেড়ে দিয়ে দলে দলে তৈরি পোশাকশিল্পে যাচ্ছেন।

হাওরে মৎস্যজীবীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন খন্দকার আনিসুর রহমান। তিনি ‘ভাসান পানি’তে মাছ ধরার আন্দোলনের নেত্রকোনা জেলা আহ্বায়ক। আনিসুর রহমান বললেন, হাওরের অর্থনীতি কৃষি ও মাছনির্ভর। তাই প্রথমত যে জলমহালগুলোর ইজারা হয়েছে, সেগুলোর সীমানা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। দ্বিতীয়, ভাসান পানিতে জেলেদের মুক্তভাবে মাছ ধরার অধিকার দিতে হবে এবং চূড়ান্তভাবে ইজারা প্রথা বাতিল করে জলমহাল উন্মুক্ত করে দিতে হবে।