ভারতীয় পাঁচ শিশু উদ্ধার

'মা কবে আসবে?'

ছবি তোলার কথা বলতেই মুখে হাসি ফোটে ছোট্ট নাসরিন, নাহিদ ও তক্কিনের (বাঁ থেকে)। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের রৌফাবাদের ছোটমণি নিবাস থেকে তোলা ছবি l জুয়েল শীল
ছবি তোলার কথা বলতেই মুখে হাসি ফোটে ছোট্ট নাসরিন, নাহিদ ও তক্কিনের (বাঁ থেকে)। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের রৌফাবাদের ছোটমণি নিবাস থেকে তোলা ছবি l জুয়েল শীল

এখনো দাঁত ওঠেনি নাহিদের। বয়স সবে ১০ মাস। কিছুক্ষণ পরপর অস্পষ্ট কণ্ঠে ‘মাম্মা মাম্মা’ বলে ডাকে। বাবা-মা ছাড়াই দুই দিন ধরে চট্টগ্রামের রৌফাবাদের ছোটমণি নিবাসে থাকতে হচ্ছে তাকে। কখনো এর কোলে, কখনো ওর কোলে ঘুরে বেড়ায় সে। জন্ম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। এইটুকু বয়সেই কী ভয়াবহ ঘটনারই না শিকার হয়েছে সে!
অপহরণের শিকার হওয়া বা পাচারের ভয়াবহতা বোঝার বয়স হয়নি চার বছরের নাসরিনেরও। তবে এটুকু বুঝতে পারছে, পরিবার থেকে সে অনেক দূরে। তাকে নানাভাবে হাসি-খুশি রাখার চেষ্টা করা হলেও একটু পরপরই থেমে থেমে কাঁদছে সে। তার একটাই প্রশ্ন, ‘আম্মা কবে আসবে?’
পাচারের শিকার হওয়া ভারতীয় পাঁচ শিশু গত সোমবার রাত থেকে চট্টগ্রামে সমাজসেবা অধিদপ্তরের হেফাজতে রয়েছে। এর মধ্যে ছয় বছরের নিচে হওয়ায় নাসরিন বেগম (৪) ও তার ভাই তক্কিন চৌধুরী (৬) এবং ১০ মাস বয়সী নাহিদ রয়েছে চট্টগ্রামের রৌফাবাদের ছোটমণি নিবাসে। আর নয় বছর বয়সী শাহিন চৌধুরী ও ১২ বছর বয়সী শামিম চৌধুরী ওরফে আবির আলী চৌধুরীকে রাখা হয়েছে হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ এলাকার সরকারি শিশু পরিবারে। এই শিশুরা বাবা-মায়ের কাছে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে আছে।
গত শনিবার রাতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে পুলিশ ভারতীয় পাঁচ শিশুকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় রেহানা বেগম নামের এক নারীকে। পরে তাঁর স্বামী বাহার উল্যাহকেও গ্রেপ্তার করে করাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, পাচারের উদ্দেশ্যেই শিশুদের বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে।
ছোটমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক ফাহমিদা আকতার চৌধুরী বলেন, নাহিদ তো কোলের শিশু। ও তেমন কিছু বোঝে না। নাসরিন ও তক্কিন বাড়ি ফেরার জন্য কান্নাকাটি করে।
গতকাল বুধবার সরকারি শিশু পরিবারে গিয়ে কথা হয় ১২ বছর বয়সী শামিমের সঙ্গে। সে জানায়, তার বাড়ি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাধাকিশোরপুর থানার খিলপাড়া এলাকায়। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সে। গত সপ্তাহে পূজার ছুটিতে মায়ের সঙ্গে পাশের এলাকা গোকূলপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যায় শামিম। তাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসা রেহানা বেগমকে সে পিসি (ফুফু) বলে ডাকে। তাদের আত্মীয়ের বাড়ির পাশেই রেহানা বেগমের ছেলের বাড়ি।

ঘরে ফিরতে ব্যাকুল শাহিন ও শামিম

শামিম বলে, ‘রেহানা পিসি মহররমের দিন (শনিবার) সকালে বলে আমারে নাকি মহররমের মেলা দেখাইতে নিয়া যাইব। জামাও কিন্যা দিব। কিন্তু মা-রে জানাইতে নিষেধ করে। মা যখন গোসল করতে যায়, তখন আমারে ডাইকা নেয়। দেখি উনার কোলে নাহিদ আর লগে শাহিন, নাসরিন, তক্কিন।’
কীভাবে সীমান্ত পার হলো সেটি স্পষ্টভাবে বলতে না পারলেও শামিম জানায়, রেহানা বেগম প্রথমে একটি অটোরিকশা ও পরে বাসে করে তাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। বাড়ি ফেরার জন্য সবাই কান্না শুরু করলে স্থানীয় লোকজন তাদের থানায় নিয়ে আসে।
সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, দুই শিশুকে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। তাদের সেবা-যত্নের কমতি নেই। তারপরও অনেক সময় মন খারাপ করে। ওদের বোঝানো হচ্ছে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবারের কাছে যেতে পারবে তারা।
ছোটমণি নিবাস ও সরকারি শিশু পরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা জানান, শিশুরা একটু পরপরই জানতে চায়, কবে বাড়ি ফিরবে। বাড়ি ফিরতে চাও—এ প্রশ্নে শাহিন ও শামিমের চোখ ছলছল করে ওঠে। শামিম বলে, ‘সবাই বলছে, বাবু (বাবা) আমাদের নিতে আসবে।’
শিশুদের উদ্ধারের বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘থানায় আনার পর শিশু শামিমের কাছ থেকে তার বাবার মুঠোফোন নম্বরে কথা বলে নিশ্চিত হই, এই শিশুরা ভারত থেকে পাচার হয়ে এসেছে। আদালতের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপদ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। আর রেহানা বেগমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
পুলিশ জানায়, রেহানা বেগম দাবি করেছেন শিশু নাহিদ তাঁর নাতি। তবে তাঁর এই দাবির সত্যতার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে পাচারের জন্য কৌশল হিসেবে অন্য শিশুদের সঙ্গে নিজের নাতিকেও বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। পাঁচ শিশুর সবার বাড়ি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাধাকিশোরপুর থানায়।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি বলেন, ‘রেহানা বেগম বেশির ভাগ প্রশ্নেরই অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছেন। তাঁর ছেলে বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতে বাস করলেও তিনি আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতেন। আগেও পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না তা বের করার চেষ্টা চলছে।’
শামিমের কাছ থেকে তার বাবা আবুল বাশার চৌধুরীর মুঠোফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ছেলে অপহৃত হওয়ার পর তাঁর মা কেবলই মূর্ছা যাচ্ছে। ওসি বলেছেন, বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের মাধ্যমে শিশুদের তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।’
কথার শেষদিকে গলা ভারী হয়ে আসে আবুল বাশার চৌধুরীর। তাঁর ছেলে কেমন আছে জানতে চান। আক্ষেপ করে বলেন, আর কয়েক দিন পরই শামিমের পরীক্ষা। এর আগে ফিরতে না পারলে তার শিক্ষাজীবন থেকে একটা বছর হারিয়ে যাবে।