মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরুর সপ্তাহ তিনেক না যেতেই বয়সে বড় এক সহপাঠীর মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সাত বছর বয়সী এক ছেলেশিশু। সেই খবর জেনে যায় মাদ্রাসার আরেক শিক্ষার্থী। পরে সেই শিক্ষার্থীও শিশুটিকে ধর্ষণ করে। এভাবে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে ধর্ষণে যুক্ত হয় ওই মাদ্রাসারই আরও তিন শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা বয়সে কিশোর।
একপর্যায়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষকও। সহপাঠীদের কাছে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিরাপত্তার জন্য শিশুটি ওই শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছিল। এ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর অদূরে সাভারের একটি মাদ্রাসায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। এ নিয়ে শিশুটির বাবা মামলাও করেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। মামলায় মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থী ও পাঁচ শিক্ষককে আসামি করা হয়েছে। শিক্ষকদের একজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এবং অন্য চার শিক্ষক ঘটনা শিশুটির মুখে শোনার পরও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো শিশুটিকে মারধর করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
শিশুটির বাবা-মা প্রথম আলোকে বলেন, অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক তাঁদের সন্তানকে এই বলে শাসিয়েছিলেন যে ঘটনাটি কাউকে বলা যাবে না। বললে, সে কখনো মক্তব থেকে হেফজখানায় উঠতে পারবে না, পরীক্ষায় পাস করবে না, কোরআনের হাফেজ হতে পারবে না। শিশুটি তার ওপর শিক্ষক ও সহপাঠীদের যৌন নির্যাতনের কথা আরেক সহকারী শিক্ষককে জানিয়েছিল। তখন মিথ্যা বলছে বলে শিশুটিকে মারধর করেন ওই শিক্ষক। বাবা-মাকে জানালে আরও বেশি মারধর করা হবে বলে ভয় দেখান শিক্ষক।
২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী শিশুটির বাসায় তার বাবার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসায় ছেলেকে দিয়েছিলাম। প্রথম ২০ থেকে ২২ দিন সব ঠিকই ছিল। এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সে বলাৎকারের শিকার হয়। প্রথমে শিক্ষার্থী এবং পরে শিক্ষক তাকে বলাৎকার করে। মামলা করেছি কিন্তু বিচার পাইনি।’
শিশুটির বাবা জানান, ঘটনা জানার পর গত ১৫ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে ছেলে ও পরিচিত কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে মাদ্রাসার মুহতামিমকে (পরিচালক) ঘটনার বিস্তারিত জানান তিনি। পরিচালক শিশুটির কথাও শোনেন। বিস্তারিত শোনার পর শিশুটির বাবাকে থানায় মামলা না করতে এবং ঘটনাটি কাউকে না জানানোর অনুরোধ করেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আশ্বাস দেন। মাদ্রাসায় পুলিশ ডেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জেলে পাঠানো হবে বলেও আশ্বস্ত করেছিলেন পরিচালক।
পরদিন ১৬ আগস্ট আবার মাদ্রাসায় যান শিশুটির বাবা। তিনি জানতে চান, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কোন থানায় দেওয়া হয়েছে। পরিচালক জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করা হয়েছে। জুতাপেটা করে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আর কোনো কিছু না করতে শিশুটির বাবাকে অনুরোধ করেন তিনি।
এদিকে শিশুটি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পূর্বপরিচিত একজন চিকিৎসকের কাছে যান শিশুটির বাবা। পরে সেই চিকিৎসক শিশুটির অবস্থা দেখে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেওয়ার পরামর্শ দেন। ১৮ আগস্ট সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে ওই দিনই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা দিয়ে শিশুটিকে ২০ আগস্ট বাড়ি নেওয়া হয় বলে জানান বাবা।
শিশুটির বাবা বলেন, ‘আমার ছেলের জীবন নষ্ট করে দিছে এরা। আমার ছেলের ভবিষ্যৎ শেষ, আমার ছেলে এখন মানসিক রোগী, বড় আশা নিয়ে ছেলেকে মাদ্রাসায় দিছিলাম। ছাত্র–শিক্ষক মিলা দীর্ঘ ছয় মাস আমার ছেলেকে বলাৎকার করছে, নির্যাতন করছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
শিশুটির বাবা সাভারের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। ধারদেনা করে ছেলের চিকিৎসা করেছেন। টাকার অভাবে এখন আর চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
মামলায় যা বলা হয়
ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে গত ২৩ আগস্ট মাদ্রাসাটির মুহতামিমসহ (পরিচালক) ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন শিশুটির বাবা। শিশুটির মৌখিক বর্ণনা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, গত ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় এক শিক্ষার্থী শিশুটিকে জোর করে টয়লেটে নিয়ে প্রথম ধর্ষণ করে। এ সময় কান্নাকাটি করলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। পরে সেই দৃশ্য দেখে ফেলে আরেক শিক্ষার্থী। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ছয়টায় আরেক শিক্ষার্থী শিশুটিকে টয়লেটে ঢুকিয়ে ধর্ষণ করে। কিছুদিন পর বিষয়টি জানতে পেরে আরেক শিক্ষার্থী ধর্ষণ করে। একইভাবে মোট পাঁচ শিক্ষার্থী তাকে ধর্ষণ করে।
এসব ঘটনা জানার পর মামলার ৬ নম্বর আসামি (মাদ্রাসাটির সহকারী শিক্ষক) শিশুটির বিছানা তাঁর নিজের বিছানার পাশে নিয়ে আসেন। পরে গত ৪ জুলাই মধ্যরাতে এই শিক্ষকও শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। এর পর থেকে তিনি একটানা শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। এজাহারে বলা হয়, নির্যাতনের সময় শিশুটি কান্না করলে ওই শিক্ষক তার মুখ চেপে ধরতেন এবং ভয় দেখাতেন।
একপর্যায়ে ৫ জুলাই শিশুটি মাদ্রাসার আরেকজন সহকারী শিক্ষককে বিষয়টি জানালে তিনি তাকে বেত দিয়ে পেটান। ঘটনা বাবা-মাকে জানালে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। পরদিন আরেক সহকারী শিক্ষকও শিশুটিকে মারধর করেন। পরে মাদ্রাসার মক্তব বিভাগের প্রধানের কাছেও অভিযোগ করে শিশুটি। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি বলে উল্লেখ করা হয় এজাহারে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কী বলছে
২ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাভারের মাদ্রাসাটিতে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার মসজিদ এবং দুটি ভবনে ছাত্ররা পড়ছে। প্রথম তিনতলা ভবনটির নিচতলায় মক্তব বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়তে দেখা যায়। রাতে সেখানেই পাশাপাশি বিছানা পেতে ঘুমায় শিক্ষার্থীরা। মামলার ৩ ও ৫ নম্বর আসামি দুই কিশোরকে পাওয়া যায় সেখানে। তবে আসামি শিক্ষকদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ৩ ও ৫ নম্বর আসামি প্রথম আলোর কাছে দাবি করে, তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়।
মাদ্রাসাটির হিসাবরক্ষক, তিন শিক্ষক ও মাদ্রাসা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ছয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের দাবি, আসামিদের মধ্যে একজন ছাত্র গত মে মাসে এবং আরেকজন তিন–চার দিন আগে মাদ্রাসা থেকে চলে গেছে। এ ছাড়া আরেক ছাত্র ভর্তি না হয়ে চলে গেছে। যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ, তিনি ১৫ আগস্ট থেকে মাদ্রাসায় অনুপস্থিত। আর ব্যবস্থা না নিয়ে ভুক্তভোগীকে মারধর ও হুমকির অভিযোগ যে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে, তাঁরাও অনুপস্থিত।
অভিযুক্ত একজন শিক্ষক, যাঁর বিরুদ্ধে শিশুটিকে পেটানোর অভিযোগ, তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। মাদ্রাসার প্রধান হিসাবরক্ষক বলেন, মামলায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর বয়স প্রকৃত বয়সের চেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২ সেপ্টেম্বর রাতে মাদ্রাসার পরিচালকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয় মাস যাবৎ এই কাজ হয়ে আসতেছে; বাচ্চা তার বাবাকেও বলল না, তার মাকেও বলল না, ছয় মাস একটানা—এগুলো হবে? এটা কোনো হইতে পারে? মানে এটা সবগুলোই একটা অবান্তর কিসিমের মনে হচ্ছে আমার কাছে। তারপরেও আমি আইনের প্রতি শতভাগ শ্রদ্ধা জানাই। এই যদি এই কাজ হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই এটা কোরআন এবং সুন্নাহবিরোধী হয়েছে। আমি চাই, সত্যিকার অর্থেই যদি কেউ অপরাধী হয়ে থাকে, তদন্ত করে কোরআন-সুন্নাহ হোক অথবা দেশের পরিচালিত আইন হোক, ওই আইনে তার বিচার শতভাগ হবে।’
পাঁচ আসামি গ্রেপ্তার
গতকাল শুক্রবার ও আজ শনিবার এই মামলার পাঁচ আসামিকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের কয়েকজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আজ দুপুর ১২টার দিকে সাভার মডেল থানায় সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার মডেল থানা–পুলিশ, আশুলিয়া থানা–পুলিশ এবং ডিবির একাধিক টিম বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে তিনজন কিশোর ও ওই মাদ্রাসার ছাত্র। তাদের বয়স ১২, ১৩ ও ১৫ বছর। গ্রেপ্তারকৃত অন্য দুই আসামি মাদ্রাসাটির শিক্ষক।