আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক।
সুন্দরবনের একটি অভিযানের বর্ণনা দিয়ে মনিরুল হক বলেন, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্বে সেই অভিযানে চোখ–হাত বাঁধা একজনকে নৌকার কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সঙ্গে ভারী বস্তা বেঁধে গুলি করেন। সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন গুলিবিদ্ধ লোকটিকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তাকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। সে সময় র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন জিয়াউল আহসান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আজ বৃহস্পতিবার এই জবানবন্দি দেন মো.মনিরুল হক। তিনি ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত র্যাব-৮ বরিশালে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জবানবন্দিতে মনিরুল হক বলেন, অধিনায়ক সম্মেলনে উঠে আসে—দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ঝুঁকি নিয়ে র্যাবের সদস্যরা গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলে আইনের ফাঁক–ফোকর দিয়ে তারা বেরিয়ে আবার অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তারা। এ ক্ষেত্রে র্যাবের করণীয় কী? তখন তৎকালীন র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে ধৃত অপরাধীদের ক্ষেত্রে ওই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলতেন।
মনিরুল হক বলেন, তৎকালীন ব্যাটালিয়নের কাছে তেমন কোনো ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ছিল না, যার মাধ্যমে সন্ত্রাসী/ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এসব কাজে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য–উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করত। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ ও গোপনীয়তা রক্ষা না হওয়ার শঙ্কায় ইন্টেলিজেন্স উইং সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্যসহ অভিযান পরিচালনা করত। বরিশাল অঞ্চলে এ রকম বেশকিছু অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে। পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লে. কর্নেল জিয়া এবং তাঁর সঙ্গে আসা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের অন্যান্য কর্মকর্তা যখন বরিশালে এসে অভিযান পরিচালনা করতেন, তখন র্যাব থেকে প্রশাসনিক সহায়তা নিতেন। এ রকম অন্তত তিনটি অপারেশনের কথা তাঁর মনে পড়ছে; যার একটি ভোলায় এবং অন্য দুটি সুন্দরবন এলাকায়।
ভোলার অপারেশনে দুজনের মরদেহ এবং সুন্দরবনে একটি অপারেশনে দুই–তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মনিরুল হক। তিনি বলেন, দুটি অপারেশনই তাঁর কাছে সাজানো মনে হয়েছে। টার্গেট এলাকায় নিয়ে ভুক্তভোগীদের হত্যা করা হয়েছে।
সুন্দরবনে আরেকটি অপারেশনের বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দিতে মনিরুল হক বলেন, সেই অপারেশনটি হয় ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি। সেদিন তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল ও তাঁর শাখার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাসহ দুই–তিনটি মাইক্রোবাস তাঁদের ব্যাটালিয়নে প্রবেশ করে। মাইক্রোবাসে তিন–চারজন চোখ–হাত বাঁধা মানুষ ছিল। মাইক্রোবাসসহ র্যাবের গোয়েন্দা শাখা পাথরঘাটা এলাকায় যাবে। এ জন্য সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী পাথরঘাটায় নৌকা প্রস্তুত করা, পথ ও নির্বিঘ্নে ফেরিঘাট পার হওয়া—এসব বিষয় তাঁদের ব্যাটালিয়ন নিশ্চিত করত। ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের নির্দেশনা মানার বিষয়ে কোনো ধরনের অপারগতা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। এই অভিযানে তাঁকে ও তাঁর উপ-অধিনায়ককেও তাঁদের সঙ্গে যেতে হয়।
মনিরুল হক বলেন, সেদিন মধ্যরাতে মাইক্রোবাস থেকে নৌকায় হাত–চোখ বাঁধা ব্যক্তিদের ওঠানো হয়। তাঁদের ওঠানো হয়ে গেলে জিয়াউল আহসান ও তাঁর সঙ্গে আসা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও নৌকায় ওঠেন এবং নৌকার ছাদের ওপর গিয়ে বসেন। নৌকা বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। সেদিন আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় মোহনার দিকে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। এক ঘণ্টার কিছু কম সময় নৌকার গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় নৌকার ছাদ থেকে জিয়াউলসহ অন্য কর্মকর্তারা নেমে যান। তিনি ছাদের ওপরেই ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নৌকার ছাদের সামনের দিকে এসে নিচে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেন সেখানে কী হচ্ছে। সেখানে তিনি একজনের শরীরে ভারী বস্তা বেঁধে গুলি করে পেট কেটে পানিতে ফেলে দিতে দেখেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আবার চার–পাঁচটি গুলির শব্দ এবং আগের মতোই পানিতে দেহ ফেলে দেওয়ার শব্দ শুনতে পান।
এ ঘটনার দুই–চার দিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা মরদেহ নদীতে ভেসে ওঠে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কয়েক দিন পর পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারেন, ওই ভেসে ওঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের।