ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে সুজন হাওলাদারকে (২৯) হত্যা করে তাঁর ব্যাটারিচালিত ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন মো. মারুফ (৩৯) ও তানভীর ঢালী আকাশ (২২)।
গতকাল বুধবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগের আদালতে আসামিরা জবানবন্দি দেন। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. খায়ের এসব তথ্য জানান।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১১ আগস্ট আশুলিয়া থানায় মামলা করেন নিহত সুজনের মা মোছা. আলো বেগম। মামলার তদন্ত করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক জামাল উদ্দীন।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ৮ আগস্ট রাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ভ্যানচালক সুজন হাওলাদার। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পরে ১০ আগস্ট বিকেলে আশুলিয়ার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ৮১ নম্বর পিলারের নিচ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ভ্যানটি আত্মসাৎ করতেই সুজনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আসামি মারুফ। ভ্যান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে পলিথিন বিছিয়ে তাঁরা বিশ্রাম করছিলেন এবং ইয়াবা সেবন করছিলেন। ইয়াবা খেয়ে সুজন ঘুমিয়ে পড়লে তখনই ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন মারুফ। পরে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে সুজনকে হত্যা করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে চাপাতি দিয়ে তাঁর গলা কেটে দেন। এরপর চাপাতিটি কচুরিপানার মধ্যে ফেলে দেন মারুফ।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মামলাটির তদন্তে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে জবানবন্দি গ্রহণের পর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন মারুফ। আর আসামি তানভীর ঢালী আকাশ চোরাই ভ্যানের ক্রেতা ছিলেন।
জবানবন্দিতে মারুফ বলেন, ৮ আগস্ট রাতে তিনি ও সুজন কিছু মালামাল আনতে কেরানীগঞ্জ থেকে গাজীপুরের কাশিমপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। দিবাগত রাত তিনটার দিকে কাশিমপুর থেকে রাজধানীর লালবাগের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। আশুলিয়া ব্রিজ পার হওয়ার পর ৯ আগস্ট সকাল সাতটার দিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে তাঁদের ভ্যানটি নষ্ট হয়ে যায়। ব্রিজের নিচে পলিথিন বিছিয়ে তাঁরা ইয়াবা সেবন করেন এবং বিশ্রাম নিতে গিয়েই সুজন ঘুমিয়ে পড়েন। মারুফ তখন ভ্যানটি মেরামত করেন। একপর্যায়ে একটি পাথর দিয়ে সুজনের মাথায় আঘাত করেন। এরপর চাপাতি দিয়ে তাঁর গলা কেটে হত্যা করেন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হত্যার পর মারুফ ভ্যানটি নিয়ে পালিয়ে যান। ৯ আগস্ট দুপুরে তিনি গাবতলীর উদ্দেশে রওনা দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ভ্যানটি মাদারীপুরের কালকিনির বাসিন্দা তানভীর ঢালী আকাশের কাছে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রির পরিকল্পনা ছিল মারুফের। ১১ আগস্ট সকালে মাদারীপুর আনসার ক্যাম্পের কাছাকাছি একটি গ্যারেজ থেকে মারুফ ও তানভীর ঢালী আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত সুজনের ভ্যান ও মুঠোফোন উদ্ধার করা হয় তাঁদের কাছ থেকে।
পুলিশ জানায়, ২৪ জুলাই সুজন নতুন ভ্যানটি কিনেছিলেন এবং এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সেটি ছিনতাই করতে তাঁকে হত্যা করা হয়।
মামলার বাদী সুজনের মা আলো বেগম জানান, সুজনের সঙ্গে কারও কোনো বিবাদ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে তিনি বলেন, ‘ক্যান আমার পোলাডারে মারল, আমি জানি না।’
সুজনের স্ত্রী মাসুদা আক্তার বলেন, ‘সে সারা দিন কাজ করত আর সন্ধ্যায় বাজার নিয়ে ফিরত। এর বাইরে আর কোথাও কোনো সঙ্গ ছিল না। কারও সঙ্গে কোনো গন্ডগোলের কথাও শুনিনি। আমার এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াব?’