রাজধানীর উত্তরার ডিএল পেট্রলপাম্পের সোয়া কোটি টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে
রাজধানীর উত্তরার ডিএল পেট্রলপাম্পের সোয়া কোটি টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে

উত্তরার পেট্রলপাম্পে লুট

একদল ঠিক করত লক্ষ্যবস্তু, আরেক দল করত ডাকাতি

রাজধানীর উত্তরার ডিএল পেট্রলপাম্পের সোয়া কোটি টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই পেশাদার ডাকাত দলের সদস্য। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও উত্তরা ক্রাইম বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রগুলো বলছে, দলটির সদস্যরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে ডাকাতি করতেন। একটি দল ঘুরে ঘুরে লক্ষ্যবস্তু ঠিক করত। আরেকটি দল তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে ডাকাতি করত। প্রয়োজনে র‍্যাব পরিচয় দিয়েও গতি রোধ করত তারা। এই কৌশলে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় ডাকাতি করে আসছে চক্রটি।

উত্তরার পেট্রলপাম্পে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. ইলিয়াস শিকদার (৩৬), মো. জাফর (৩৬), রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল (৩৪), মিন্টু রাঢ়ি (২৩) ও সাগর বাড়ৈ (৪০)।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ডাকাতদের একটি দল বিমানবন্দর, উত্তরা এলাকায় ঘুরে ঘুরে লক্ষ্যবস্তু ঠিক করত। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে, ডাকাত দলকে জানাত। পরে সুযোগ বুঝে ডাকাত দলের সদস্যরা টাকা, স্বর্ণালংকার লুট করে নিতেন। কখনো প্রাইভেট কারে, আবার কখনো মোটরসাইকেলে করে গতি রোধ করে লুট করেন। আবার ডাকাতির সুবিধার্থে এই দলের সদস্যরা নিজেদেরকে র‍্যাবের বলেও পরিচয় দিতেন। তাঁদের কাছ থেকে র‍্যাবের পোশাক ও ভুয়া পরিচয়পত্রও পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় এভাবে ডাকাতি করে আসছে দলটি।

৯ আগস্ট সকালে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর সড়কের ক্রাউন প্লাজার সামনে কর্মচারীকে কুপিয়ে ডিএল পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ছিনতাইয়ের ঘটনায় পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক আবদুল করিম অজ্ঞাতপরিচয় ছয়-সাতজনের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলায় বলা হয়েছে, ছিনতাই হওয়া ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ডিএল পেট্রলপাম্পের।

ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে ডিবি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্য জানান। লুট হওয়া ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ডাকাত দলের এক সদস্যের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া লুটের টাকা ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম

শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর ডিবি ও উত্তরা ক্রাইম বিভাগ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ইলিয়াস শিকদার ও জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইলিয়াস শিকদারের বিমানবন্দর এলাকার ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে র‍্যাব লেখা ৩টি ভেস্ট ও ২টি ক্যাপ, ২টি নম্বর প্লেট, র‍্যাবের মনোগ্রামযুক্ত ৪টি ভুয়া পরিচয়পত্র, ৩টি ওয়াকিটকি সেট, ৪ জোড়া হাতকড়া, ২টি পিস্তল, ৩টি ম্যাগাজিন ও ৬টি গুলি উদ্ধার করা হয়।

ডিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাঁদের দেওয়া তথ্যে পরে মাতুয়াইল থেকে রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল ও যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকা থেকে মিন্টু রাঢ়িকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় রবিউলের ভাড়া বাসা থেকে লুট করা টাকার মধ্যে ৩ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। আর মিন্টু রাঢ়ির ভাড়া বাসা থেকে র‍্যাব লেখা ৪টি ভেস্ট, ২টি স্টিলের ও ৪টি অফসেট পেপারের নম্বর প্লেট, র‍্যাবের মনোগ্রামযুক্ত ৪টি ভুয়া পরিচয়পত্র, ১টি মোটরসাইকেল, ওয়াকিটকি সেট ও চার্জার, ৩ জোড়া হাতকড়া, ২টি পিস্তল, ৩টি ম্যাগাজিন ও ১৫টি পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়। রবিউল ও মিন্টুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্যামপুরের পোস্তগোলা থেকে লুট করা ৯ লাখ টাকাসহ সাগর বাড়ৈকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শফিকুল ইসলাম বলেন, সাগরের নামে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে, তিনি পেশাদার অপরাধী। ঢাকায় আগেও একই কায়দায় বাইকে এবং মাইক্রোবাসে করে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাই করেছেন। এ ছাড়া রুবেলের বিরুদ্ধে চারটি মামলা, মিন্টুর বিরুদ্ধে তিনটি, জাফরের বিরুদ্ধে দুটি ও ইলিয়াসের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, তাঁরা এ ঘটনার সম্পূর্ণ তথ্য উদ্‌ঘাটন করেছেন। এ ঘটনার সঙ্গে আরও ৬-৭ জন জড়িত রয়েছেন। টাকা উদ্ধারও বাকি রয়েছে।

মূল হোতা এখনো পলাতক

শফিকুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনার মূল হোতা এখনো পলাতক। তাঁকে ধরতে চেষ্টা করছেন তাঁরা। গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে তিনজন সক্রিয়ভাবে এই লুটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা ঢাকা শহরে একাধিক ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

পেট্রলপাম্পের কেউ জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখনো প্রতিষ্ঠানের কারও জড়িত থাকার বিষয় পাইনি। যিনি মূল হোতা, তাঁকে ধরা হলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। এই গ্রুপকে যদি ধরা যায়, আমি মনে করি, এ ধরনের অপরাধের একটা মেজর (বড়) অংশ কমে যাবে। সাগরের নামে ১৩টি মামলা আছে এবং যিনি এটার মূল হোতা, তাঁর নামেও ২০টির বেশি মামলা আছে।’

লুটের পর ডাকাতেরা টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ডাকাত দলের মূল হোতা টাকার বড় অংশ নিয়েছেন। আর বাকি টাকা দলের অন্য সদস্যরা আনুপাতিক হারে ভাগ করে নিয়েছেন। জড়িত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে অভিযান চলছে।

ডাকাত দলের এক সদস্যের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম

সাগর বাড়ৈ ৭ দিনের রিমান্ডে

এদিকে ডাকাতির মামলায় সাগর বাড়ৈয়ের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু বক্কর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এসআই আবু বক্বর বলেন, আজ আসামিকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মো. নজরুল ইসলাম ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। শুনানিকালে আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী ছিলেন না।