কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে দেয়াললিখন। গতকাল কুমিল্লার টাউন হল মাঠসংলগ্ন এলাকায়
কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে দেয়াললিখন। গতকাল কুমিল্লার টাউন হল মাঠসংলগ্ন এলাকায়

দেয়ালে কিশোর গ্যাংয়ের নাম, কুমিল্লায় অভিযানেও থামছে না অপরাধ

পাঠাগার, মিলনায়তনের অনুষ্ঠান, মাঠের আড্ডা আর আশপাশের দোকানপাট—এসব ঘিরে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের টাউন হল এলাকা সব সময় জনসমাগম থাকে। সেই টাউন হলের মাঠঘেঁষা দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে লেখা ‘সিবিকে’, ‘ডিবিএক্স’, ‘কেজিএস’।

টাউন হলের সামনের ফুটপাতে পোশাক বিক্রি করেন আবদুল মোত্তালেব। নামগুলো কারা লিখল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ওই দিকে তাকাইও না। পোলাপান ভালো না। সন্ধ্যার দিকে উঠতি বয়সী ছেলেরা মাঠে আসে। লেখাগুলো তারাই লিখেছে।’

এই তিনটি নামই কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। দেয়ালে নাম লিখে নিজেদের পরিচয় জানানোর চেষ্টা। এখন দেয়ালের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দল গড়া ও শক্তি প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে কুমিল্লা শহরে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরের প্রায় ৯ মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব দলের সদস্যদের নাম এসেছে। তবে এ ধরনের অপরাধী চক্রের তৎপরতা চলছে এক দশকের বেশি সময় ধরে। তবে বর্তমানে কতগুলো অপরাধী চক্র সক্রিয়, তার কোনো হালনাগাদ তালিকা নেই জেলা পুলিশের কাছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম পাওয়া গেছে। ‘কিশোর গ্যাং’ বলা হলেও সবাই কিশোর নয়; দলনেতাসহ সদস্যদের অনেকের বয়স ১৮ বছরের বেশি।

আমরা ওই দিকে তাকাইও না। পোলাপান ভালো না। সন্ধ্যার দিকে উঠতি বয়সী ছেলেরা মাঠে আসে। লেখাগুলো তারাই লিখেছে।
পোশাক বিক্রেতা আবদুল মোত্তালেব

সম্প্রতি স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৬২৪ জনকে আটক করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭৩ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে ১৭৩ জনের সবার বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলেনি পুলিশ।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ২৫০ জনের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকে দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।

তবে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশেরও দায় আছে বলে মনে করেন জেলার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কাইমুল হক। তাঁর বক্তব্য, মামলার এজাহারে অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও আসামির আগের অভিযোগের তথ্য না থাকলে বড় অপরাধে জড়িত ব্যক্তিও আইনি প্রক্রিয়ায় সুবিধা পেতে পারেন।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, বড় অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি ও অপরাধের যথাযথ তদন্ত জরুরি।

অনেকে দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান

দেয়ালে পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল

কুমিল্লা টাউন হলের পাশের মার্কেটের পেছনের মাঠঘেঁষা দীর্ঘ দেয়ালে কালো রঙে লেখা ‘সিবিকে’ ও ‘ডিবিএক্স’। মাঝে লাল রঙে ‘কেজিএস’। একটু এগোলে আবার একই নাম। দেয়ালের নিচের অংশেও লেখাগুলো আছে। মাঠের অপর পাশে কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবের সামনের দেয়ালেও ডিবিএক্স লেখা রয়েছে।

সাধারণত বিভিন্ন অনলাইন বা টিকটক-ভিত্তিক কিশোর অপরাধী চক্র এ ধরনের সাংকেতিক নাম যুক্ত করে অপরাধ জগতে এবং সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের গ্রুপকে তুলে ধরে।

ডিবিএক্স (ডেডলি বয়েজ) এবং কেজিএস (কিং গ্যাংস্টার স্কোয়াড)—এ দুটির পেছনে কারা, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কুমিল্লার আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘কিং স্কোয়াডের’ সঙ্গে কেজিএসের কিছুটা মিল রয়েছে। আর ডিবিএক্স লেখাটির সামনে একই কালিতে লেখা রয়েছে ‘প্রিন্স নেহাল’।

এর মধ্যে সিবিকে পুলিশের কাছে ‘কুমিল্লা ব্রাদার্স কমিউনিটি’ পুলিশের কাছে পরিচিত। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তানজিম আবদুল্লাহ নামের এক গ্যাং নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, তানজিম সিবিকে এবং এর অধীন বিভিন্ন নামের কয়েকটি উপদলের নেতৃত্ব দিতেন। তখন এসব দলের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি ও মোটরসাইকেলে মহড়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। দলগুলোয় আনুমানিক ৭৫০ সদস্য থাকার কথাও বলেছিল পুলিশ।

ডিবিএক্স (ডেডলি বয়েজ) এবং কেজিএস (কিং গ্যাংস্টার স্কোয়াড)—এ দুটির পেছনে কারা, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কুমিল্লার আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘কিং স্কোয়াডের’ সঙ্গে কেজিএসের কিছুটা মিল রয়েছে। আর ডিবিএক্স লেখাটির সামনে একই কালিতে লেখা রয়েছে ‘প্রিন্স নেহাল’।

কুমিল্লায় দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম লেখার উদাহরণ পুরোনো। ২০২২ সালে ধর্মসাগরপাড়সহ নগরের বিভিন্ন দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম ও লোগো দেখা যায় বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়। তখন দলগুলোর মেসেঞ্জার গ্রুপ ও নির্দিষ্ট আড্ডাস্থল থাকার কথাও উঠে আসে। বর্তমানে দেয়ালের পাশাপাশি টিকটকের ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের জড়ো করার তথ্য প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এসেছে। এরপর দলবদ্ধভাবে সড়কে নামা, মোটরসাইকেলে মহড়া ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে।

পুরোনো দল, নতুন উপদল

২০১৫ সালের দিকে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত দলের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে দাঁড়ায়। বর্তমানে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ বেশি আলোচনায় রয়েছে। অপু ও সাব্বিরের নামে আরও দুটি দলের তথ্যও পাওয়া গেছে।

একই সদস্যের একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরার নজির রয়েছে। বড় দলের ভেতরে আলাদা নামে উপদলও তৈরি হয়েছে। পুলিশের হালনাগাদ তালিকা না থাকায় কতটি দল এখন সক্রিয়, কার নেতৃত্বে কোনটি চলছে এবং সদস্যরা এক দল থেকে অন্য দলে যাচ্ছে কি না—তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া ঘিরে গ্যাংয়ের সংঘাতের তথ্য এসেছে। গত বছরের ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কয়েকটি পক্ষ মহড়া দেয়। এতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। ওই মহড়ায় সিবিকে ও ইগলের নাম আসে। দুই দিন পর যৌথ বাহিনী দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকায় নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়।

চলতি বছরের মে মাসে ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় আরেকটি অস্ত্রের মহড়ার তথ্য পাওয়া যায়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে জানান, দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া ঘিরে গ্যাংয়ের সংঘাতের তথ্য এসেছে। গত বছরের ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কয়েকটি পক্ষ মহড়া দেয়। এতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। ওই মহড়ায় সিবিকে ও ইগলের নাম আসে।

অপ্রতিম হত্যার পর নতুন অভিযান

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।

এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশের ভাষ্য, প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি বয়সে বড়দের সঙ্গে অপ্রতিমের যোগাযোগ ও টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের বিষয় সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সর্বশেষ অভিযানের বিষয়ে কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান গতকাল বিকেলে জানান, আগের রাতের অভিযানে আটক হওয়াদের মধ্যে যে ৪৫১ জন মুচলেকায় ছাড়া পেয়েছে, তাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কয়েকটি থানায় আলাদাভাবে খোঁজ নেয় প্রথম আলো। কোতোয়ালি মডেল থানা এলাকায় ৭১ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩০ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। বাকিদের ক্ষেত্রে মাদক সেবনের অভিযোগ, মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

কোতোয়ালি থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে চারজন পরিচিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বিভিন্ন পরিচিত অপরাধী চক্রে কাজ করে। তাদের বিরুদ্ধে আগেও মামলা হয়েছে; বিষয়গুলো আরও তদন্ত করা হচ্ছে।

অপ্রতিম হত্যার পর আলোচনায় থাকা সদর দক্ষিণ মডেল থানা এলাকায় ৪৪ জন আটক হয়। তাদের মধ্যে ৩০ জনকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অপর ১৪ জনের মধ্যে ৯ জনকে ৩৪ ধারায় (সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী নির্দিষ্ট অপরাধ) এবং ৫ জনকে ১৫১ ধারায় (আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার) আদালতে পাঠানো হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, আদালতে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে পরিচিত গ্যাংয়ে সরাসরি জড়িত কয়েকজন আছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় এখনই প্রকাশ করছেন না তিনি। তবে অভিযানে আটক সবাইকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলা যাচ্ছে না।

দাউদকান্দিতে হট্টগোল, ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার

কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল থানার ভেতরের একটি কক্ষের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে

বুধবার রাতের অভিযানে দাউদকান্দি মডেল থানা ও গৌরীপুর তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা ৫৯ কিশোরকে আটক করেন। রাত আটটার দিকে থানা ভবনে হট্টগোল হয়। অভিভাবকদের হামলা ও আসবাব, দরজা-জানালা ভাঙচুরের মধ্যে আটক কয়েকজন কিশোর থানা থেকে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। তবে থানা ও জেলা পুলিশ হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই রাতে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ শতাধিক মানুষ থানার ভেতরে ছিলেন। একপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। একটি কক্ষে রাখা ২৮ কিশোরের অধিকাংশ দরজা ভেঙে বেরিয়ে যায়। তাদের কয়েকজন ও বাইরে থাকা অভিভাবকেরা থানার সামনে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কক্ষটির আসবাব এলোমেলো, একটি প্লাস্টিকের চেয়ার উল্টে এবং দরজা ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়। তবে দরজা কখন বা কীভাবে ভেঙেছে, তা ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম পলাশ সাংবাদিকদের বলেন, আটকের খবর পেয়ে অভিভাবকেরা থানায় এসে সন্তানদের ফিরিয়ে নিতে হট্টগোল শুরু করেন। এ সময় একটি পুরোনো দরজার অংশ খুলে যায়। লোকজনের ভিড়ে কিছু চেয়ার উল্টে যায়। তবে থানায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ঠিক নয়। তথ্য যাচাই করে অভিভাবকদের মুচলেকা নিয়ে কিশোরদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লায় পুলিশের অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত সন্দেহে ৪৬ জনকে আটকের পর সদর দক্ষিণ মডেল থানা প্রাঙ্গণে স্বজনদের অপেক্ষা। গত বুধবার মধ্যরাতে তোলা

গতকাল সন্ধ্যায় ওসি প্রথম আলোকে বলেন, আটক ৫৯ জনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। রাতের মধ্যেই সবাইকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান। তিনি গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তথ্য যাচাইয়ের জন্য ২৮ জনকে থানার একটি পরিত্যক্ত কক্ষে রাখা হয়। সেখানে অভিভাবকেরা জড়ো হয়ে হট্টগোল করলে কয়েকজন কিশোর বেরিয়ে আসে। কেউ কেউ ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেয়। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। চলে যাওয়া কিশোরদের অভিভাবকেরা ফিরিয়ে আনেন। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি এবং শিক্ষার্থী—এমন কিশোরদের বিস্তারিত যাচাই-বাছাই শেষে মুচলেকায় ছাড়া হয়েছে।

থানায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগকে ‘গুজব’ উল্লেখ করে লুৎফুর রহমান বলেন, ওই কক্ষের দরজা আগে থেকেই ভাঙা ছিল। সেখানে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।

মামলার দুর্বলতা ও নজরদারির প্রশ্ন

পিপি কাইমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার রাতের অভিযানে আটক অনেককে ৩৪ ও ১৫১ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সন্দেহের বাইরে নির্দিষ্ট অপরাধের তথ্য না থাকলে তাদের আটকে রাখার সুযোগ সীমিত।

কাইমুল হক বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে এজাহার তৈরি করতে হবে। অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ এবং আসামির বিরুদ্ধে আগের মামলা বা অভিযোগ থাকলে সেটিও উল্লেখ করতে হবে। মামলা দায়েরে পুলিশকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সপ্তাহে এক-দুই দিন এ ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম দফার অভিযানে কিছু ত্রুটি নজরে এসেছে বলেও স্বীকার করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান। তিনি বলেন, সেগুলো কাটিয়ে পরবর্তী অভিযান চালানো হবে। মুচলেকায় ছাড়া পাওয়া কিশোরদেরও নজরদারিতে রাখা হবে।

পুলিশের পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নও (এসআরবি)। এসআরবি-১১-এর সিপিসি-২ কুমিল্লার উপপরিচালক মেজর সাদমান ইবনে আলম প্রথম আলোকে বলেন, সাবেক র‍্যাব ও বর্তমান এসআরবি আগেও কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। তারা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে।

মেজর সাদমান দাবি করেন, ‘আমরা মূলত গ্যাং কালচারে নেতৃত্বে থাকা কিশোর বা তরুণদের বেশি গ্রেপ্তার করেছি। এদের মধ্যে চলতি বছরেই অন্তত ২০ জন গ্যাং লিডারকে ধরা হয়েছে।’ সামনে অভিযান আরও কার্যকর করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্যাংগুলোর নেতৃত্বে কারা রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টাউন হলের পাশের দেয়ালে লেখা নামগুলো রয়ে গেছে। প্রকাশ্যে গ্যাংয়ের পরিচয় জানানোর পুরোনো প্রবণতা এবং অপরাধের পর নতুন করে অভিযান—দুটিই কুমিল্লায় দেখা যাচ্ছে।

কুমিল্লা নাগরিক অধিকার ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক মো. আবদুল লতিফের মতে, জেলার ১৮ থানায় একযোগে এমন অভিযান আগে দেখা যায়নি। তবে অভিযানের ধারাবাহিকতা জরুরি। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি থাকলে কিশোর গ্যাং এভাবে উত্থান করার সুযোগ পেত না।’

আবদুল লতিফের ভাষ্য, অপরাধে জড়ানোর শুরুতেই কিশোরদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, সন্ধ্যার পর কোথায় থাকে এবং কার সঙ্গে মেশে—অভিভাবকদেরও সেসব বিষয়ে খোঁজ রাখতে হবে।