মিরপুরে নিহত যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ
মিরপুরে নিহত যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ

মিরপুরে যুবদল কর্মী খুন

খুনের লক্ষ্য ছিলেন যুবদল নেতা, খুনি এসেছিল ঝিনাইদহ থেকে

রাজধানীর মিরপুরে যুবদল কর্মী হত্যার পেছনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের মধ্যকার অন্তঃকোন্দলকেই কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে যাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁদের ভাড়া করে আনা হয়েছিল ঝিনাইদহ থেকে।

মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকায় শুক্রবার রাতে গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ (৪৫)। আহত হন আরেক যুবদল কর্মী মনির হোসেন ও সবজি বিক্রেতা সালাম সরদার।

কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর বাসার পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় তাঁদের ওপর হামলা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিলেন হাফিজুল ইসলাম।

নিহত ইউসুফ আলীর বড় ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে আজ শনিবার সকালে কাফরুল থানায় হত্যা মামলা করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই খুনিদের ‘টার্গেট’ ছিলেন না। হাফিজুল ইসলামের সঙ্গে চলতেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাজনৈতিক কোন্দল, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হাফিজুলকে হত্যার জন্যই চারজন ভাড়াটে খুনিকে ঝিনাইদহ থেকে চার দিন আগে ঢাকায় আনা হয়।

সূত্রটি জানায়, হামলার আগে যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুর বাড়ি ও নিচতলার ব্যক্তিগত কার্যালয় রেকি করেছিল খুনিরা। এরপর গতকাল শুক্রবার রাতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান নেন হাফিজুলের বাড়ির সামনে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাফিজুল ও তাঁর অনুসারীরা তখন বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন অপরিচিতকে দেখে সন্দেহ হয় আড্ডারত যুবদল নেতা-কর্মীদের। পরিচয় জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কোমর থেকে পিস্তল বের করে গুলি করা শুরু করেন এক যুবক। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ইউসুফ। তখন হাফিজুল ও আরেক যুবদল কর্মী মনির হোসেন এগিয়ে এলে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে খুনিরা। হাফিজুল বেঁচে গেলেও গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন মনির।

ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করেছে পুলিশ। তাতে দেখা গেছে, হামলাকারী চারজন ছিলেন। তাঁরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন।

কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু (মাঝে সানগ্লাস পরা)। তার পেছনে (লাল গোল দাগে চিহ্নিত) ইউসুফ আলী পারভেজ। পাশে (লাল গোল দাগে চিহ্নিত) পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াও সম্প্রতি খুন হন

হাফিজুল ইসলাম বাবু প্রথম আলোকে বলেন, একটি জানাজা শেষে বাসার পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা বলছিলাম। এক ছোট ভাই ফোনে জানায়, দোকানের পাশে দুজন সন্দেহজনক লোক ঘোরাফেরা করছে। ইউসুফ গিয়ে তাঁদের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। তাঁরা রেগে কথা বলা শুরু করে। তখন ইউসুফ একজনকে জাপটে ধরতে গেলে সে কোমর থেকে পিস্তল বের করে বুকে গুলি করে।

হাফিজুল ইসলাম বলেন, তিনি এগিয়ে গেলে আরেক যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। মাটিতে পড়ে যাওয়ায় গুলি তাঁর শরীরে লাগেনি। তখন লোকজন ধাওয়া দিলে তাঁরা ফাঁকা গুলি করতে করতে পালিয়ে যান। তখন একজনকে পিস্তলসহ আটক করেন স্থানীয় লোকজন।

চঞ্চল মোল্যা (৩৪) নামের আটক ওই ব্যক্তিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর ঝিনাইদহ থেকে আসার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

সূত্রটি বলেছে, চঞ্চলসহ চারজন চার দিন আগে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসেন। মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে তাঁদের রাখা হয়। হাফিজুল ইসলামকে খুন করতেই তাঁদের ভাড়া করা হয়। তবে কারা তাঁদের ভাড়া করে ঢাকায় এনেছে, তা এখনো স্বীকার করেননি চঞ্চল।

এ ঘটনায় কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করেছেন। দুই মামলায় চঞ্চলসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অন্য তিনজন হলেন জিহাদ মোল্লা (৩৪), জিয়ারুল মোল্লা (৩৯) ও হাসান (৩৫)।

চঞ্চলকে আজ আদালতে হাজির করা হয়। তাঁকে তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। রিমান্ডের আবেদনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইউসুফ আলী ভূঁইয়া বলেন, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার নেপথ্যের কারণ, ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস এবং পলাতক আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ঘটনার নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সন্দেহের প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজ প্রথম আলোকে বলেন, এই ঘটনায় যদি যুবদলের কোনো নেতার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।