
একজন মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন, পেছনে ধাওয়া করছেন মাস্ক পরা দুজন, একের পর এক গুলি, মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি, মৃত্যু ঘটনাস্থলেই।
গত বছরের ১০ নভেম্বর, বেলা পৌনে ১১টায় পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে ঠিক এভাবেই প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে। পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায়। কিন্তু ভিডিওতে খুনিদের চেনার মতো কোনো স্পষ্ট সূত্র ছিল না। কারণ, দুজনের মুখেই ছিল মাস্ক, তাঁরা পালিয়েও যান খুব দ্রুত।
এমন অবস্থায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল গোয়েন্দাদের কাছে। কোনো দিক থেকে কূল–কিনারা না পেয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা ভিডিওটি দেখান তাঁর এক ‘সোর্স’কে। কয়েক সেকেন্ড দেখেই ওই ‘সোর্স’ বলে ওঠে, ‘স্যার, একজনের গুলির ধরন কুত্তা ফারুকের মতো।’
এই এক বাক্যই তদন্তে এনে দেয় গতি। সেই সূত্র ধরে শুরু হয় প্রযুক্তিগত তদন্ত। গ্রেপ্তার করা হয় ফারুক হোসেন ফয়সালসহ পাঁচজনকে। গ্রেপ্তার পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যার রহস্য।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঢাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ থেকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় তারিক সাঈফ মামুনকে। আর এই হত্যার নির্দেশ দেন তাঁরই একসময়ের বন্ধু, আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সানজিদুল ইসলাম ইমন। তিনি অপরাধজগতে ‘ক্যাপ্টেন ইমন’ নামে পরিচিত।
২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মামুনকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রথম হামলা হয়েছিল। তেজগাঁওয়ে সেই হামলা থেকে মামুন বেঁচে গিয়েছিলেন। দুই বছর পর নতুন ছক কষে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় হত্যা করা হয় তাঁকে।
এই মামলার তদন্ত তদারক করছেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোর্সের দেওয়া প্রাথমিক ধারণা থেকেই তদন্তের ভিত্তি তৈরি হয়। পরে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায় সংশ্লিষ্টদের পরিচয়। খুনিরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিল। তবে তার আগেই দুই শুটারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
নাটকীয়ভাবে ধরা পড়ে খুনিরা
মামুন সেদিন তাঁর বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে পুরান ঢাকায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে গিয়েছিলেন। হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পর আক্রান্ত হন তিনি। মামুন দৌড়ে রাস্তার ওপারে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢুকে পড়লে ধাওয়া করে গিয়ে দুই ব্যক্তি খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, মামুন পালানোর চেষ্টা করেও রক্ষা পাননি।
এ ঘটনায় মামুনের স্ত্রী বিলকিস আক্তার সূত্রাপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ডিবি শুরুতে এই মামলার ছায়া তদন্ত করছিল। তখনই গুলিবর্ষণকারী হিসেবে ফারুক হোসেন ফয়সাল ও রবিন আহম্মেদ পিয়াসকে শনাক্ত করা হয়।
ঘটনার পরদিন ১১ নভেম্বর নরসিংদী থেকে ফারুক ও রবিনের পাশাপাশি মো. রুবেল নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিনই ঢাকার মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় শামীম আহম্মেদ ও মো. ইউসুফ জীবন নামের দুজনকে।
মামুন হত্যার পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার অভিযানের নেতৃত্ব দেন ডিবির লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নূরে আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রযুক্তিগত তদন্তে বোঝা যাচ্ছিল, আসামিরা সিলেট সীমান্তে অবস্থান করছিল। তাঁরা ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের ধরতে দ্রুততম সময়ে মাইক্রোবাসে করে ঢাকা থেকে সিলেটের পথে আমরা রওনা হই। নরসিংদী শহর পেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই দেখি, সিলেট থেকে ঢাকামুখী একটি বাসের জানালা দিয়ে ফারুক উঁকি দিচ্ছেন। দ্রুততম সময়ে মাইক্রোবাস ঘুরিয়ে ওই বাসের পিছু নিই আমরা। নরসিংদী শহরে বাসটি যানজটে আটকা পড়লে ওই বাস থেকেই ফারুকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করি।’
সোর্সের দেওয়া প্রাথমিক ধারণা থেকেই তদন্তের ভিত্তি তৈরি হয়। পরে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায় সংশ্লিষ্টদের পরিচয়। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর আগেই দুই শুটারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম, যুগ্ম কমিশনার, ডিবি
আসামিরা ‘নাটকীয়ভাবে’ ধরা পড়ে মন্তব্য করে গোয়েন্দা কর্মকর্তা নূরে আলম বলেন, আসামিরা সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে যেতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ কারণে তাঁরা সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এ জন্য তাঁরা সিলেট থেকে ঢাকা ফিরছিল।’
সন্দেহভাজন হিসেবে ফারুককে শনাক্ত করার পর তার বিভিন্ন সময়ের ছবি সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছিল ডিবি।
‘এ জন্য তাঁকে দেখে চিনে ফেলি। অনেকটা নাটকীয়ভাবে আসামিরা গ্রেপ্তার হন,’ বলেন নূরে আলম।
হত্যার ছক তৈরি করা রনি এখনো অধরা
গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবি কর্মকর্তারা জানান, সানজিদুল ইসলাম ইমনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আরেক সন্ত্রাসী রনি তৈরি করেছিলেন মামুন হত্যার ছক। সে অনুযায়ী, মামুনকে গুলিতে হত্যা করেন ফারুক ও রবিন। তবে রনি এখনো অধরা। পাশাপাশি হত্যার নির্দেশদাতা সানজিদুল ইসলাম ইমনের অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। তিনি দেশে আছেন, নাকি বিদেশে অবস্থান করছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রায় ২৪ বছর কারাগারে থাকার পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান মামুন। এরপর তিনি নতুন অপরাধী দল গঠনের চেষ্টা করছিলেন। এ নিয়ে ইমনের সঙ্গে পুরোনো বন্ধুত্বে ফাটল তৈরি হয়।
ডিবি সূত্র জানায়, মামুনের ওপর গুলি চালান ফারুক ও রবিন। পুরো সময়জুড়ে মামুনের গতিবিধি নজরে রাখছিলেন কামাল নামে তাঁদের এক সহযোগী। তিনি মামুনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে শুটারদের জানাচ্ছিলেন। আদালত থেকে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পরই মামুনকে লক্ষ্য করে ফারুক ও রবিন গুলি চালান। হত্যাকাণ্ডের পরপরই দ্রুত সরে যান তাঁরা। বেড়িবাঁধ হয়ে রায়েরবাজারে গিয়ে জড়ো হন। সেখানে রনির নির্দেশে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি জমা রাখা হয় ইউসুফের কাছে। ইউসুফের কাছে অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন শামীম।
বন্ধু ইমন যেভাবে শত্রু হলেন
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার অপরাধজগতের এই দ্বন্দ্বের শিকড় অনেক পুরোনো। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চল—ধানমন্ডি, কলাবাগান, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর—ছিল দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তারিক সাইফ মামুনের নিয়ন্ত্রণে। কারাগারে থাকলেও এসব এলাকায় তাঁদের প্রভাব কমেনি। তাঁদের গড়ে তোলা ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী সে সময় রাজধানীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এই দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তাঁরা গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন।
প্রায় ২৪ বছর কারাগারে থাকার পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান মামুন। মুক্তির পর তিনি নতুন অপরাধী দল গঠনের চেষ্টা করছিলেন। এ নিয়ে ইমনের সঙ্গে পুরোনো বন্ধুত্বে ফাটল তৈরি করে।
গোয়েন্দাদের ভাষ্য, তখনো কারাগারে থাকা অবস্থায়ই ইমন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং মামুনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এরই অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে মামুনের ওপর প্রথম হামলা চালানো হয়। সিটি পেট্রলপাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝামাঝি সড়কে ১০-১২ জনের একটি দল মামুনের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরিস্থিতি বুঝে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মামুন। হামলাকারীরা তখন তাঁকে কুপিয়েও হত্যার চেষ্টা চালায়। তবে সে যাত্রায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এই হামলায় ভুবন চন্দ্র শীল নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তখন এই ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল।
অপরাধজগৎ নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ইমনের ভয়ে মামুন ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল ছেড়ে পূর্বাঞ্চলের আফতাবনগরে বাসা নেন। কারণ, এই এলাকায় ইমনের আধিপত্য ছিল না। কিন্তু তবু মামুনের শেষ রক্ষা হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারামুক্ত হয়ে ইমন অপরাধজগতে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ধানমন্ডি, কলাবাগান, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের এলাকায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে সুযোগ খুঁজতে থাকেন পুরোনো সহযোগী মামুনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার। দ্বিতীয় চেষ্টায় মামুনকে হত্যা করতে সমর্থ হন ইমন। তাঁকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।