
দেশে চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত শিশুধর্ষণের ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে শিশুধর্ষণের মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯%। আর ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৯৮%।
মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে দোকানে ১০০ টাকা ভাংতির জন্য যায় ১১ বছরের শিশুটি। বিস্কুট দেওয়ার কথা বলে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটিকে একটি পরিত্যক্ত জায়গায় নিয়ে ধর্ষণ করেন ও তার ভিডিও করে রাখেন। পরে শিশুটিকে সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে কাছে ডাকতেন ওই ব্যক্তি। সবশেষ গত ১৮ জুন শিশুটি মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে ওই ব্যক্তি টানাহেঁচড়া করলে সে চিৎকার করে দৌড়ে বাড়ি পৌঁছে মায়ের কাছে ঘটনা জানায়।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় মামলার এজাহারে। গত ১৯ জুন শিশুটির মা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০–এর ৯(১) ধারায় মামলা করেছেন। মামলার আসামি আল আমিন (৩৭) বিবাহিত। এই মামলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শত শত শিশুধর্ষণ মামলার একটি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত দুই বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে শিশুধর্ষণের মামলার চিত্র ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত শিশুধর্ষণের ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছর একই সময়ে মামলার সংখ্যা ছিল ৯৯৮। আর ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে মামলা হয়েছিল ৭৫১টি। এই হিসাবে গত বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এবার মামলা বেড়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, সার্বিকভাবে চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা হয়েছে, এর মধ্যে ৪ হাজার ২৫টি মামলা হয়েছে ধর্ষণের অভিযোগে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করার দণ্ড, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ।
ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশে সাক্ষ্য গ্রহণ, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করা হচ্ছে। তবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক, ধর্মীয় সংগঠনসহ সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে কমানো কঠিন।এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন, সহকারী মহাপরিদর্শক, গণমাধ্যম শাখা, পুলিশ সদর দপ্তর
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শিশুধর্ষণের ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশ পরিচিত ব্যক্তি, স্বজন, প্রতিবেশী বা বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিদের মাধ্যমে হয়। অনেক পরিবার সামাজিক কারণে, ভয় বা বিভিন্ন চাপের কারণে ঘটনা গোপন রাখার চেষ্টা করে বা অভিযোগ করতে বিলম্ব করে, ফলে তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
শাহাদাত হোসাইন বলেন, ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশে সাক্ষ্য গ্রহণ, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করা হচ্ছে। তবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক, ধর্মীয় সংগঠনসহ সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে কমানো কঠিন।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের ওই শিশুধর্ষণের মামলার বিষয়ে জানতে কথা হয় ভুক্তভোগী পরিবার, আসামির পরিবার ও পুলিশের সঙ্গে।
শিশুটির মেজ ভাই সম্প্রতি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিন মাসের বেশি হয়ে গেছে আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। ভয়ে বোনকে অন্য জায়গায় রেখেছেন। চারদিকের নানা চাপে তাঁরা মামলার ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, আসামির পরিবার সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে দেনদরবার করছে। টাকার প্রলোভন দেখাচ্ছে। তবে তাঁরা রাজি হননি।
এদিকে আসামি আল আমিনের বাবা মো. তাইজ উদ্দিন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছেলে বলছে সে কিছু করেনি। ধর্ষণের অভিযোগ সত্য নয়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। আসামি মুঠোফোন ফেলে পালিয়েছেন। তাঁর ফোন জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে। ওসি বলেন, ঘটনাটি গ্রামে সালিসে নিষ্পত্তির প্রস্তাব উঠেছিল। ধর্ষণের মামলা সালিসযোগ্য বা আপসযোগ্য নয়।
শিশুধর্ষণের ঘটনা এখন নাগরিক জীবনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পর্যায়ে চলে গেছে। ধর্ষণের পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে মামলাগুলো যথাযথভাবে পরিচালনার মাধ্যমে ধর্ষকের সাজা নিশ্চিত করতে হবে।উমর ফারুক, চেয়ারম্যান, অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দেশে ধর্ষণের ঘটনা থামছেই না। এ বছর রাজধানীর পল্লবীর শিশুধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়ে মানুষ। আলোচিত এ ঘটনার ১৯ দিনের মধ্যে গত ৭ জুন মামলার রায় হয়। ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক রায়ে আসামি সোহেল রানা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন।
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক ছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনা আলোচিত হয়। ওই ছাত্রী গত ২ জুলাই কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার পর ২০ আগস্ট ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে আসামি মাদ্রাসাশিক্ষকই নবজাতকের জৈবিক বাবা বলে শনাক্ত হন।
২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মোট ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, এসব মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের। যার মধ্যে নারীধর্ষণের মামলা ৫ হাজার ১৭১টি আর শিশুধর্ষণের মামলায় ১ হাজার ৮৯৭টি।
গত বছর মাগুরায় এক শিশুধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় করা মামলায় গত ৩১ আগস্ট আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। হিটু শেখ শিশুটির বোনের শ্বশুর।
২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে হওয়া ১৭ হাজার ৫৭১ মামলার মধ্যে ধর্ষণের মামলা ৫ হাজার ৫৬৬টি। এর মধ্যে শিশুধর্ষণের মামলা ১ হাজার ২১৯টি শিশুধর্ষণের অভিযোগ।
উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, সবশেষ গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ২০২৪ সালে ‘শিশু যৌন নির্যাতন: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে দায়েরকৃত মামলার ওপর একটি গবেষণা’ শিরোনামে গবেষণা করে। এতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।
উমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, শিশুধর্ষণের ঘটনা এখন নাগরিক জীবনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পর্যায়ে চলে গেছে। ধর্ষণের পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে মামলাগুলো যথাযথভাবে পরিচালনার মাধ্যমে ধর্ষকের সাজা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের মতো অপরাধ ঠেকাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মূল্যবোধ শিক্ষা ও নারীর প্রতি মর্যাদাশীল আচরণের ভিত তৈরি করাও জরুরি।