হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে কড়া পুলিশি পাহারায় সালমান এফ রহমানকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া হয়। ১৭ আগস্ট ২০২৬
হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে কড়া পুলিশি পাহারায় সালমান এফ রহমানকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া হয়। ১৭ আগস্ট ২০২৬

বিআইএফএফএলের সাবেক সিইওকে নির্যাতন ও হুমকি

ঋণের জন্য নির্যাতনের মামলায় সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার দেখালেন আদালত

তিস্তা সোলার ও বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অনৈতিক ঋণসুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) মারধর, প্রাণনাশের হুমকি ও জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার মামলায় সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্বাস উদ্দীন বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদ রানা ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মো. মনিরুল ইসলাম খান ও খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জামিনে রয়েছেন। আর কারাবন্দী সালমান এফ রহমানকে আজ এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। মামলার প্রধান আসামি আব্দুর রউফ তালুকদারসহ বাকি তিন আসামি এখনো পলাতক।

এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন বিআইএফএফএলের সাবেক সিইও এস এম ফরমানুল ইসলাম। আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। মামলায় সালমান এফ রহমান ছাড়াও সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বিআইএফএফএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থাকাকালে এস এম ফরমানুল ইসলামকে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ–সুবিধা দিতে অনৈতিক চাপ দেওয়া হয়। বিশেষ করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন ‘তিস্তা সোলার’ প্রকল্পের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) ঋণ ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় তৎকালীন সিইও ফরমানুল ইসলাম তাতে অস্বীকৃতি জানান।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাঁর ওপর চাপ আরও বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ২০০ কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ডে আগাম বিনিয়োগ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই শতকোটি টাকার ঋণ ছাড়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তবে ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত জটিলতা থাকায় সেই প্রস্তাবেও সম্মতি দেননি ফরমানুল ইসলাম।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই বিআইএফএফএলের ৮০তম পর্ষদ সভায় কাঙ্ক্ষিত ঋণ ও বিনিয়োগ–সুবিধা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ফরমানুল ইসলামের ওপর চড়াও হন আসামিরা। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করা হয়। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক তাঁর কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর দাপ্তরিক মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন, প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহারে বাধা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি তাঁকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়।

জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মারধর, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের এসব অভিযোগ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। আসামিরা আদালতে হাজির না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর মামলার ৩ নম্বর আসামি মনিরুল ইসলাম খান ও ৫ নম্বর আসামি খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন।

মামলার বাদী এস এম ফরমানুল ইসলাম আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৯ সালে আব্দুর রউফ তালুকদার যখন ফাইন্যান্স সেক্রেটারি ছিলেন, তখন তিনি অতিমাত্রায় খবরদারি করা শুরু করেন। তিনি বলেন যে সালমান এফ রহমানকে টাকা দিতে হবে, তিস্তা সোলার প্রজেক্টে লোন দিতে হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর আগে সালমান এফ রহমান আমাকে চাপ দিত। আমি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিলাম। তখন আমি টাকা দিতে চাইনি। নাফিস শারাফাতও অবৈধ লোন দাবি করেন। তাঁদের কথা না শোনায় আমাকে চাকরিচ্যুত করে এবং কোনো প্রকার নোটিশ ছাড়া আমাকে বের করে দেয়। পরদিন আমি গুলশান থানায় গিয়ে জিডি করি। কিন্তু এতে কোনো সুরাহা হয়নি। আদালত আজ এই মামলায় সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন।’