সিআইডির অভিযানে গ্রেপ্তার ৭, ৫৬টি পাসপোর্ট উদ্ধার

বিমানবন্দরে গিয়ে নারী জানতে পারেন, তাঁর ভিসায় আরেকজন ইতালি চলে গেছেন

জালজালিয়াতির মাধ্যমে ইতালিতে মানব পাচারে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার সাতজন
ছবি: সিআইডির সৌজন্যে

ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে এক পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে আরেক নারীকে ইতালিতে পাঠানোর অভিযোগে একটি মানব পাচার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চক্রটির বিরুদ্ধে ইতালিতে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে মানব পাচারের অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

আজ মঙ্গলবার সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সিআইডি জানায়, গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশান ১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী গুলশান থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। পরে এ মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন বেলায়েত হোসেন (৪০), নাজমুল হাসান (১৯), মেহেদী হাসান (৩৭), সোলাইমান সুমন (৩২), ফজলে রাব্বী (২৭), তৌহিদুর রহমান (২৪) ও কাওসার হোসেন (৪২)।

সিআইডি আরও জানায়, অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, ৩টি সিপিইউ, ১টি ল্যাপটপ, ১টি এম্বোস সিল এবং আড়াই লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

যেভাবে প্রতারণা

মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করেন। চার সন্তানকে নিয়ে ইতালিতে যাওয়ার আশায় তিনি ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। দীর্ঘ সময় ধরে পাসপোর্ট জমা থাকায় মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে দূতাবাস থেকে তা নবায়নের জন্য বলা হয়। নবায়নের জন্য দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে আসামি নাজমুল হাসানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে দ্রুত পাসপোর্ট নবায়ন ও ইতালির ভিসা করে দিতে সক্ষম ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে তাঁকে গুলশান ১ এলাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যান। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে পরিচয় তাঁকে করিয়ে দেন।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ইতালির ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করেন। চুক্তিতে ভিসা হওয়ার পর সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। ভিসা হওয়ার পর ওই নারী দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করলে নাজমুল তাঁর কাছ থেকে চুক্তির টাকা দাবি করেন। টাকা না পেয়ে তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে নেন। পাসপোর্ট ফেরত পেতে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ও ১১ মে দুই দফায় ওই নারী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা দেন। টাকা পাওয়ার পর তাঁকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।

সিআইডির ভাষ্য, ভিসা পেয়ে ভুক্তভোগীর স্বামী তাঁদের জন্য বিমানের টিকিট কাটেন। নির্ধারিত দিনে তিনি সন্তানদের নিয়ে ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে গেলে কর্মকর্তারা জানান, তাঁর পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে ২৪ এপ্রিলই অন্য আরেক নারী ইতালি চলে গেছেন। এ ঘটনার পর তিনি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে সিআইডির মানব পাচার শাখায় অভিযোগ করেন।

তদন্তে যা পাওয়া গেছে

প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করে সিআইডি জানায়, অভিযোগের পর তদন্তে ভিসা জালিয়াতি ও মানব পাচারের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে চক্রটির সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। চক্রটি বিদেশে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের ইতালির ভিসা ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। তারা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠাত। জব্দ করা ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত।

প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির হোতা হিসেবে অভিযুক্ত বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় হওয়া একটি মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

সিআইডি জানিয়েছে, জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল, কম্পিউটারসহ অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি চক্রটির অন্য সদস্য, দেশি-বিদেশি সহযোগী এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।