মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারের সাদেক খান ইটখোলা এলাকায় ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব, আগের হামলা-পাল্টা হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার ও জামিন—এত কিছুর পরও দুই পক্ষের তৎপরতা থামেনি। সর্বশেষ মীমাংসার কথা বলে ডেকে এনে গত বুধবার রাতে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আবারও ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, কয়েক বছর ধরে ইটখোলা এলাকায় ইয়াবার কারবারে সঙ্গে জড়িত ছিলেন আসাদুল। তাঁর সঙ্গে বিরোধ বাঁধে ওই এলাকার আরেক মাদক কারবারি মো. আকতার হোসেনের সঙ্গে। সেই দ্বন্দ্বের জেরেই গত বুধবার গভীর রাতে তাঁকে ফোন করে ডেকে এনে হত্যা করা হয়।
গত বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে সাদেক খান ইটখোলা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আসাদুলের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আসাদুল মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিংয়ে থাকতেন। ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত এক সপ্তাহে রায়েরবাজার এলাকায় এটি ছিল দ্বিতীয় খুনের ঘটনা।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, কয়েক বছর ধরে ইটখোলা এলাকায় ইয়াবার কারবারে সঙ্গে জড়িত ছিলেন আসাদুল। তাঁর সঙ্গে বিরোধ বাঁধে ওই এলাকার আরেক মাদক কারবারি মো. আকতার হোসেনের সঙ্গে। সেই দ্বন্দ্বের জেরেই গত বুধবার গভীর রাতে তাঁকে ফোন করে ডেকে এনে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ পুলিশ ও র্যাব আলাদা অভিযান চালিয়ে নিহত আসাদুলের প্রতিপক্ষ আকতার হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নিহত আসাদুলের চাচাতো বোন অঞ্জু আক্তার বাদী হয়ে মামলা আকতার হোসেনসহ নয়জনকে আসামি করে গতকাল শুক্রবার মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, আকতার অনেক দিন ধরে এলাকায় মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন। নিজেকে শ্রমিক দলের মোহাম্মদপুর থানার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সদস্যসচিব পরিচয় দিয়ে এলাকায় পোস্টারও লাগিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আসাদুল খুন হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; এর পেছনে ছিল পুরোনো দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ে ইটখোলা এলাকায় আকতারকে কুপিয়ে জখম করেছিলেন আসাদুল। ওই ঘটনায় আসাদুলসহ ছয়জনকে আসামি করে মামলা হয়। ওই মামলায় তখন আসাদুল গ্রেপ্তার হলে অল্পদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসেন। তবে এরপর আসাদুল আর আগের মতো ওই এলাকায় মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি।
পুলিশ সূত্র জানায়, আসাদুলের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চারটি মামলা রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে চারবার গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। স্থানীয় লোকজন জানায়, আসাদুল ‘চার্লি’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়েরও নেতা ছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই এলাকায় মাদক বেচাকেনার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা থাকার কথা নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক দোকানি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ সবই জানে, ব্যবস্থা নেয় না।’
এই দ্বন্দ্বের সর্বশেষ প্রকাশ্য ঘটনা ঘটে গত ১৭ মার্চ। পুলিশ সূত্র বলছে, সেদিন আকতারের সহযোগী নয়নকে মারধর করেন আসাদুল। এরপর থেকে আসাদুল ইটখোলা এলাকায় কম যেতেন। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে বন্ধু ওলিউর তাঁকে ফোন করে ইটখোলা এলাকায় ডাকেন। নয়নকে মারধরের ঘটনাটি মীমাংসার কথা বলেই তাঁকে সেখানে নেওয়া হয় বলে পুলিশের ধারণা। এলাকায় পৌঁছানোর পর কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
মোহাম্মদপুর আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত মার্চ মাসে বিভিন্ন অপরাধে ৬৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। আসাদুল হত্যার আসামিদেরও ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টহল জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর আসাদুল জেলে যাওয়ার পর থেকে ইটখোলা এলাকায় ইয়াবা কারবারের পুরো নিয়ন্ত্রণ আকতার হোসেনের হাতে চলে যায়। সন্ধ্যার পর ইটখোলার পাশের দুটি টিনের খুপরিতে ইয়াবা সেবনের আসর বসত। আকতারের সহযোগীরাই কেনাবেচার কাজ করতেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সেখানে ইয়াবা কিনতে আসতেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই এলাকায় মাদক বেচাকেনার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা থাকার কথা নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক দোকানি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ সবই জানে, ব্যবস্থা নেয় না।’
তবে পুলিশ বলছে, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত মার্চ মাসে বিভিন্ন অপরাধে ৬৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। আসাদুল হত্যার আসামিদেরও ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টহল জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই হত্যাকাণ্ডে গতকাল পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ, দুজনকে র্যাব। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আকতার হোসেন (৪৫), মো. মুন্না (২৪), মিরাজ ফকির (২২), মো. নয়ন ওরফে খোকন (২৪), মো. আসাদুল ইসলাম (২৫) ও মো. শাওন (২৭)। থানা-পুলিশ সূত্র বলছে, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে গ্রেপ্তার ছয়জনকেই দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা বলেন, গ্রেপ্তার ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্বেই আসাদুলকে খুন করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।