রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরতে প্রেস ব্রিফিংয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম। মঙ্গলবার রাতে পল্লবী থানায়
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরতে প্রেস ব্রিফিংয়ে  ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম। মঙ্গলবার রাতে পল্লবী থানায়

পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতি গ্রেপ্তার

শিশু রামিসাকে হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়েছিল: পুলিশ

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার পর পাশের ফ্ল্যাটে থাকা এক দম্পতি লাশ গুম করার চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানা (৩৪) এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) গ্রেপ্তারের পর এ কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর–১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তিনতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটিকে হত্যার পর তার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিচ্ছিন্ন মাথা শৌচাগারে পাওয়া যায়। শিশুটির শরীরের মূল অংশটি পাওয়া যায় খাটের নিচ থেকে।

এ ঘটনায় পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতিকে গ্রেপ্তারের পর রাত সোয়া ১০টার দিকে পল্লবী থানায় প্রেস ব্রিফিং করা হয়। সেখানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খুঁজতে থাকেন। বাসার সামনে এক পাটি জুতা দেখতে পেয়ে তিনি পাশের ফ্ল্যাটে সন্দেহ করেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তিনি ডাকাডাকি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে দরজা খুললে সহযোগী আসামি স্বপ্না আক্তারকে পাওয়া যায়। তবে মূল আসামি সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে প্রবেশ করে ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভিকটিমের সঙ্গে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত চলমান। এ ছাড়া প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অপরাধ গোপন ও মরদেহ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে আসামি মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু ভিকটিমের মা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় সে তার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করতে পারেনি এবং পালিয়ে যায়।

রামিসা আক্তার

সোহেল রানাকে সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর বাড়ি নওগাঁর সিংড়ায় বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

পুলিশ ও পরিবার জানায়, রামিসা আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তাঁর বাবার নাম আবদুল হান্নান মোল্লা। তিনি একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মায়ের নাম পারভীন আক্তার। তাঁদের দুই মেয়ের মধ্যে রামিসা ছোট। বড় মেয়ে রাইসা আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীর মিরপুর–১১ নম্বরের সেকশনের বি ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। শিশুটির লাশ পাওয়া যায় পাশের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে।

দুপুরের পর পল্লবীর ওই বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে উৎসুক জনতার ভিড়। ভিড় ঠেলে বাসায় ঢুকতেই দেখা যায়, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করছেন। রামিসাদের বাসায় স্বজনের ভিড়। একটি কক্ষে রামিসার মা–বাবা বাক্‌রুদ্ধ হয়ে বসে ছিলেন।

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানা

রামিসার চাচা এ কে এম নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোন রাইসার সঙ্গে রামিসার স্কুলে যাওয়ার কথা। হঠাৎ রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁর মা পারভীন ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দেখেন, রামিসার পায়ের একটি জুতা পড়ে আছে। তখন পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করেন। ভেতর থেকে বন্ধ দরজাটি তখন খোলা হচ্ছিল না। অনেক সময় ধরে নক করা হলেও দরজা খোলা হয়নি। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

সোহেল রানা বিকৃত রুচির হতে পারে, ধারণা পুলিশের

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, সোহেল রানার বিরুদ্ধে নাটোর জেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগের একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর আচরণ ও স্ত্রী স্বপ্নার প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, সে বিকৃত মানসিকতা ও বিকৃত যৌনরুচির হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

গ্রেপ্তার স্বপ্না আক্তারের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, স্বপ্না দাবি করেছেন, তিনি ঘুমের ওষুধ সেবন করে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন না। তবে তদন্তে দেখা গেছে, রামিসার মা দরজায় ধাক্কা দেওয়ার পরেও দীর্ঘ সময় দরজা না খোলা এবং মূল আসামি সোহেল রানার পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে তিনি সহযোগিতা করেছেন। রামিসার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।