হত্যা
হত্যা

‘ফাঁদে’ ফেলে কলেজছাত্রকে হত্যা, নেপথ্যে প্রেম, বিচ্ছেদ, ব্ল্যাকমেল: পিবিআই

ঈদের দিন বিকেলে সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কলেজের মাঠে বসে গল্প করছিলেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইসমাইল হোসেন ওরফে ইমন এবং তাঁর সাবেক প্রেমিকা। সেই আড্ডার আড়ালেই ধাপে ধাপে এগোচ্ছিল ইমনকে হত্যার পরিকল্পনা।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তর থেকে। ওই বইয়ে ইমন হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ইমন ঢাকার একটি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর ওই তরুণী হত্যাকাণ্ডের সময় একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন। পিবিআই বলছে, হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন ওই তরুণী। সেদিন ইমনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

ইমন হত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায়, ২০২১ সালের ১৩ মে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। পরদিন ১৪ মে সন্ধ্যায় শিবচরের সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের খাসচর বাঁচামারা এলাকার আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ইমনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৬ মার্চ এ ঘটনায় মামলা হয়। শুরুতে মামলাটি তদন্ত করে শিবচর থানার পুলিশ। পরে মামলার তদন্তভার যায় পিবিআইয়ের কাছে।

ইমন ঢাকার একটি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর ওই তরুণী হত্যাকাণ্ডের সময় একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন। পিবিআই বলছে, হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন ওই তরুণী। সেদিন ইমনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

পিবিআই প্রকাশিত বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত শুরুর পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল, ঈদের দিন ইমন কাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং তাঁদের চলাচলের পথ যাচাই করে দেখা হয়। এ ঘটনায় তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে হত্যার দায় স্বীকার করে তিনি আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন বলে পিবিআই জানায়।

তরুণী জবানবন্দিতে বলেন, ইমনের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁদের দুজনের কিছু ‘ঘনিষ্ঠ’ ছবি ও ভিডিও ইমনের কাছে চলে যায়। পরে সম্পর্ক ভেঙে গেলে তাঁর বিয়ে ঠিক হয় আরেকজনের সঙ্গে। বিষয়টি জানার পর ইমন তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং দেখা করতে চান। একই সঙ্গে ওই ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এ পরিস্থিতিতে তরুণী হবু স্বামী কামরুজ্জামান, চাচা তোবারক ফরাজী ও আরেক তরুণীকে নিয়ে ইমনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইমন হত্যায় প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ধাপে ধাপে একটি ‘মৃত্যুফাঁদ’ তৈরি করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাপ্রবাহে আনুমানিক সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

তরুণী জবানবন্দিতে বলেন, ইমনের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁদের দুজনের কিছু ‘ঘনিষ্ঠ’ ছবি ও ভিডিও ইমনের কাছে চলে যায়। পরে সম্পর্ক ভেঙে গেলে তাঁর বিয়ে ঠিক হয় আরেকজনের সঙ্গে। বিষয়টি জানার পর ইমন তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং দেখা করতে চান। একই সঙ্গে ওই ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।

হত্যার দিন বেলা ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ মাঠে ইমনের সঙ্গে দুই তরুণীর দেখা হয়। এর আগে শিবচরের সূর্যনগর মোড় থেকে ছুরি ও ঘুমের ওষুধ মেশানো কোমল পানীয় তরুণীর কাছে দেওয়া হয়।

সূর্যনগর মোড় থেকে দুই তরুণী ভ্যানে করে কলেজ এলাকায় যান। কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন ইমন। একপর্যায়ে ইমনকে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানীয় দেওয়া হলে তিনি পান করেন। পরে অটোরিকশায় করে পুরোনো ফেরিঘাটের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় ইমনকে।

পিবিআইয়ের বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, নদীর পারে বসে ছবি ও ভিডিও দেওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে তর্ক হয়। একপর্যায়ে তরুণী ছুরি বের করে ইমনের গলায় দুই দফা আঘাত করেন। পরে কামরুজ্জামান ছুরিটি নিয়ে আরও আঘাত করেন। এরপর দুজনে মিলে তাঁকে নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন।

পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, এটি কোনো তাৎক্ষণিক ঝগড়া বা আবেগ থেকে হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং ইমনকে দেখা করার নামে ডেকে এনে হত্যা করা হয়। পুরো ঘটনায় প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির আলাদা দায়িত্ব ছিল এবং সবাই অভিন্ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করেছেন।