উৎকণ্ঠার এক রাত পেরিয়ে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী জঙ্গিমুক্ত করেছিল গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি। ২০১৬ সালের ২ জুলাই ভোরের দৃশ্য
উৎকণ্ঠার এক রাত পেরিয়ে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী জঙ্গিমুক্ত করেছিল গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি। ২০১৬ সালের ২ জুলাই ভোরের দৃশ্য

ফিরে দেখা

হোলি আর্টিজানের সেই রাত, এক দশকেও মুছে যায়নি যে ক্ষত

ঢাকার গুলশান লেকপাড়ের যে জায়গায় একসময় ছিল হোলি আর্টিজান বেকারি, সেখানে এখন বহুতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এক দশক আগে এই জায়গাটিই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। গুলশানের সেই ৭৯ নম্বর সড়ক, কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তাবলয়, লেকপাড়ের রেস্তোরাঁ—সবকিছু মিলিয়ে ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতটি বাংলাদেশকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছিল।

আজ ১ জুলাই, সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের হিসাবে এক দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই রাতের আতঙ্ক, স্বজন হারানোর আর্তনাদ, বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং শিক্ষিত-সচ্ছল পরিবারের তরুণদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে হোলি আর্টিজান এখনো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত।

২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যার পর গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। ইফতারের পর কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে। শুরু হয় জিম্মি সংকট। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। এরপর র‍্যাব, সোয়াট, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।

আজ ১ জুলাই, সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের হিসাবে এক দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই রাতের আতঙ্ক, স্বজন হারানোর আর্তনাদ, বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং শিক্ষিত-সচ্ছল পরিবারের তরুণদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে হোলি আর্টিজান এখনো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত।

প্রথম দফায় জিম্মিদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। পরে তাঁরা মারা যান। আহত হন আরও অনেকে। রাতভর গুলশানের রাস্তায় অপেক্ষা করেন জিম্মিদের স্বজনেরা। কেউ জানতে পারছিলেন না, ভেতরে তাঁদের প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন কি না।

পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে ঢোকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু তারপরই স্পষ্ট হয় হামলার ভয়াবহতা। রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ২০ জিম্মির লাশ। তাঁদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২।

যাঁরা মারা গিয়েছিলেন সেই রাতে

হোলি আর্টিজানে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা বারবার বলা হয় ২২ জন। কিন্তু এক দশক পর ফিরে তাকালে শুধু সংখ্যায় সেই ক্ষতির গভীরতা বোঝা যায় না। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ। ছিলেন ভারতীয় তরুণী তারিশি জৈন। ছিলেন ইতালির নাগরিক ক্লাউদিয়া কাপেল্লি, ভিনচেনসো দালেস্ত্রো, মার্কো তোন্দাৎ, নাদিয়া বেনেদিত্তি, সিমোনা মন্তি, ক্রিস্তিয়ান রসি, মারিয়া রিবোলি, আদেলে পুলিজি ও ক্লাউদিয়া দান্তোনা। ছিলেন জাপানের নাগরিক ওকামুরা মাকাতো, কোয়ো ওগাসাওয়ারা, হাসিমাতো হিদেকো, তানাকা হিরোশি, সাকাই ইউকু, শিমুধুইরা রুই ও কুরুসাকি নুবুহিরি।

সাত জাপানি নাগরিক বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মৃত্যু শুধু মানবিক ক্ষতি নয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক আস্থার ওপরও বড় ধাক্কা ছিল। ইতালীয় নাগরিকদের মৃত্যু ইউরোপীয় মহলে গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি করে। কূটনৈতিক এলাকা গুলশানে বিদেশিদের লক্ষ্য করে এমন হামলা বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে নাড়িয়ে দেয়।

হোলি আর্টিজানের নিষ্ঠুরতা ছিল পরিকল্পিত। তদন্ত ও জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বয়ানে উঠে আসে, জিম্মিদের ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়েছিল হামলাকারীরা। বাংলাদেশি মুসলমানদের কেউ কেউ সুরা পড়তে পারায় বেঁচে যান। বিদেশিদের হত্যা করা হয় গুলি করে ও কুপিয়ে।

আইএসের দায় স্বীকার, পুলিশের ভাষ্য—নব্য জেএমবি

হামলা চলাকালেই ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস ঘটনার দায় স্বীকার করে। আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ জানায়, ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় আইএসের সদস্যরা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করেছে। ওই রাতেই আমাক নিউজ রেস্তোরাঁর ভেতরের রক্তাক্ত কয়েকজনের ছবি প্রকাশ করে। ভোরের দিকে সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

হোলি আর্টিজান হামলার আগে প্রায় দেড় বছরে দেশে উগ্রগোষ্ঠী-সংশ্লিষ্ট অন্তত ২৭টি হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন ২৮ জন। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ব্লগার, লেখক-প্রকাশক, শিয়া সম্প্রদায়, হিন্দু পুরোহিত, বিদেশি নাগরিক, খ্রিষ্টান, খানকা-পীর ইত্যাদি। এর মধ্যে আইএস ১৭টির দায় স্বীকার করেছিল অনলাইনে নিজস্ব প্রচারমাধ্যমে আমাক নিউজে। যদিও তখনকার সরকারের ভাষ্য ছিল—হামলাগুলোর পেছনে ছিল দেশীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, বিশেষত নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম। এর মধ্যে নব্য জেএমবিকে আইএস মতাদর্শী, আর আনসার আল ইসলামকে আল-কায়েদা মতাদর্শী মনে করা হয়।

অবশ্য নব্য জেএমবি নামটি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া, এই গোষ্ঠীর কেউ অবশ্য নিজেদের এই পরিচয় দেয়নি। তারা নিজেদের আইএস দাবি করত। তৎকালীন সরকার যেহেতু আইএসের অস্তিত্ব স্বীকার না করার নীতি নিয়েছিল, আর এই গোষ্ঠীর সংগঠকদের বড় অংশ জেএমবি থেকে এসেছিল, তাই পুলিশ নিও জেএমবি বা নব্য জেএমবি নাম দেয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হোলি আর্টিজানে হামলার পেছনে আইএস মতাদর্শীদের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করে নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়া। দ্বিতীয়ত, বিদেশি নাগরিক হত্যা করে নৃশংসতার প্রকাশ ঘটানো। তৃতীয়ত, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়া।

জঙ্গি হামলার পর তছনছ হোলি আর্টিজান বেকারি

পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি

হোলি আর্টিজানে হামলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল কয়েক মাস আগে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আইএস মতাদর্শী গোষ্ঠীটির কথিত শুরা কমিটি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া এলাকায় বৈঠক করে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় বড় হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।

বৈঠকে এই গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সংগঠক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী বিদেশিদের ওপর হামলার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়, হামলার মূল সমন্বয়ক হবেন তামিম। সহ–সমন্বয়কের দায়িত্ব পান নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান। লজিস্টিক সহায়তায় যুক্ত হন বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট, তানভীর কাদেরীসহ কয়েকজন।

হামলার জন্য বেছে নেওয়া হয় পাঁচ তরুণকে। তাঁদের ভাষায় ‘ইসাবা’ বা আক্রমণকারী দল। তাঁদের মধ্যে তিনজন ঢাকার সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান-রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের। রোহান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সামেহ মোবাশ্বের স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল পাস করেছিলেন। নিবরাস ঢাকার টার্কিশ হোপ স্কুল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন বগুড়ার খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল।

হোলি আর্টিজান দেখায়, ইংরেজি মাধ্যম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সচ্ছল পরিবার, নগরজীবন—কোনোটিই উগ্রবাদী মতাদর্শ থেকে স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা দেয় না। অনলাইন প্রভাব, গোপন নেটওয়ার্ক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মতাদর্শিক প্ররোচনা মিলেই নতুন ধরনের চিত্র সামনে আসে।

‘হিজরত’-এর নামে বাড়ি ছাড়েন

হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ ঘটনার অনেক আগে ‘হিজরত’-এর নামে বাড়ি ছাড়েন। তাঁদের পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিল। রোহান ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। সামেহ মোবাশ্বের ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বনানীর বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। খায়রুলও দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন বলে তাঁর পরিবার পরে জানায়।

এই অংশটি হোলি আর্টিজান-পরবর্তী আলোচনায় বড় হয়ে ওঠে। কারণ, পরিবারগুলো প্রথমে তাঁদের সন্তানকে নিখোঁজ হিসেবে খুঁজেছে; পরে জানতে পেরেছে, সেই সন্তান সন্ত্রাসবাদী হামলায় জড়িয়েছে। এতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন সতর্কবার্তা তৈরি হয়—একজন তরুণের আচরণগত পরিবর্তন, হঠাৎ বিচ্ছিন্নতা, অনলাইন আসক্তি, গোপন যোগাযোগ কিংবা ধর্মীয় ভাষ্যের নামে উগ্র মতাদর্শে ঢুকে পড়া—এসব আর ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বাড়ি ছাড়ার পর এসব তরুণকে রাখা হয় ঝিনাইদহ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও পাবনার বিভিন্ন আস্তানায়। তদন্তে উঠে আসে, তাঁদের শুধু তাত্ত্বিক দীক্ষা দেওয়া হয়নি; বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি ও শিয়া অনুসারীদের ওপর হামলায় ব্যবহার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁদের হত্যায় অভ্যস্ত করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।

২০১৬ সালের মে মাসে নির্বাচিত পাঁচজনকে গাইবান্ধার সাঘাটার ফুলছড়ি চরে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের অস্ত্র চালানো ও বোমা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ, আশ্রয়, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তার দায়িত্বে ছিল নব্য জেএমবির কয়েকজন সংগঠক। হামলার আগে তাঁদের একাধিক আস্তানায় রাখা হয় এবং ধাপে ধাপে ঢাকায় আনা হয়।

গুলশানে লেকের পাড়ের সবুজে ছাওয়া হোলি আর্টিজান বেকারি বিদেশিদের কাছে ছিল আকর্ষণীয় গন্তব্য

হোলি আর্টিজান কেন লক্ষ্যবস্তু

তদন্তে উঠে আসে, আইএস মতাদর্শী গোষ্ঠীটির লক্ষ্য ছিল গুলশান-বনানী এলাকার এমন কোনো স্থানে হামলা চালানো, যেখানে বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি বেশি এবং নিরাপত্তা অপেক্ষাকৃত ঢিলেঢালা। জুনের মাঝামাঝি থেকে গুলশান এলাকার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ রেকি করে তারা। শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় হোলি আর্টিজান বেকারি।

রেস্তোরাঁটি বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে ভিড় বাড়ত। পেছনে ছিল লেক, ফলে হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এক দিক থেকে মোকাবিলা করতে হবে—এ হিসাবও ছিল হামলাকারীদের। ঘটনাস্থল চূড়ান্ত হয় হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। আর সরাসরি হামলাকারীদের জানানো হয় হামলার মাত্র তিন-চার দিন আগে।

২৭, ২৮ ও ২৯ জুন কয়েক দফা রেকি (আক্রমণ–পূর্ব পর্যবেক্ষণ) করা হয়। রোহান, নিবরাস ও সামেহ মোবাশ্বের আগে থেকেই রেস্তোরাঁটি চিনতেন। পরে তামিম চৌধুরী হামলাকারীদের নিয়ে বসেন এবং রোহানকে আক্রমণকারী দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বসুন্ধরার আস্তানা থেকে রক্তাক্ত গুলশান

হামলার আগে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়। সেখানে জুনের শুরু থেকে ধাপে ধাপে ওঠেন তানভীর কাদেরী, বাশারুজ্জামান, মারজান, তামিম চৌধুরী এবং পাঁচ হামলাকারী। ওই বাসাতেই অস্ত্র, গুলি, চাপাতি ও হাতে তৈরি বোমা রাখা হয়।

হামলার দিন ১ জুলাই বিকেলের দিকে দুই ভাগে ভাগ হয়ে পাঁচ হামলাকারী বসুন্ধরার বাসা থেকে বের হন। কিছু পথ রিকশায়, কিছু পথ হেঁটে তাঁরা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে পৌঁছান। ইফতারের পর শুরু হয় হামলা। তাঁরা ভেতরে থাকা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করেন। রাতেই একে একে ২০ জনকে হত্যা করা হয়।

বাইরে তখন ক্রমশ বাড়ছিল উদ্বেগ। গুলশানের সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গণমাধ্যমকর্মীরা জড়ো হন। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের নজর পড়ে ঢাকার ওপর। রাত যত গড়ায়, উৎকণ্ঠা তত বাড়ে। হামলাকারী কতজন, ভেতরে কতজন জিম্মি, কে বেঁচে আছেন, কে মারা গেছেন—এসব নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।

অভিযানের পর শুরুতে বলা হয়েছিল ছয়জন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে। পরে জানা যায়, তাঁদের একজন ছিলেন রেস্তোরাঁর কর্মী সাইফুল ইসলাম। তাঁর পরিবার দাবি করে, তিনি হামলার শিকার।

আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা ‘আমাক’ পাঁচ আক্রমণকারীর ছবি প্রকাশ করে। পরে তাঁদেরই মূল হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁরা হলেন রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

কোলাজ ছবিতে জঙ্গি হামলায় তছনছ হোলি আর্টিজান বেকারি

অভিযানের পর অভিযান

হোলি আর্টিজানে হামলা ছিল কথিত নব্য জেএমবির সবচেয়ে বড় আঘাত। একই সঙ্গে সেটি তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অভিযানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। হামলার ছয় দিন পর, ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার চেষ্টা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরে জানান, হোলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার হামলা একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এরপর দেশজুড়ে শুরু হয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হন কথিত নব্য জেএমবির প্রধান সংগঠক তামিম আহমেদ চৌধুরী। পরে ঢাকার আজিমপুর, রূপনগরসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযানে নিহত বা গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হোলি আর্টিজানের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অর্থ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এসব অভিযানে নিহত হন। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন।

হোলি আর্টিজান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ভূমিকা বাড়ে। উগ্রপন্থায় জড়িত সন্দেহে নিখোঁজ তরুণদের তালিকা তৈরি করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অনলাইন র‍্যাডিক্যালাইজেশন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, গোপন আস্তানা ও শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করে সদস্য সংগ্রহ—এসব বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মামলায় আসামিদের কার কী দায় ছিল, তা উঠে এসেছিল পুলিশের অভিযোগপত্রে

মামলা ও রায়

হোলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। দুই বছরের বেশি সময় তদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তদন্তে বলা হয়, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। পরিকল্পনা, অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও সহায়তার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; একজনকে খালাস দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন।

পরে হাইকোর্ট সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি হামলা মামলার বিচারিক পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়।

হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ঠেকাতে গিয়ে নিহত পুলিশ সদস্যের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য দীপ্ত শপথ

স্থায়ী সতর্কবার্তা

হোলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। গত এক দশকে বাংলাদেশে ওই মাত্রার আর কোনো হামলা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইএসপন্থী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দাবি করে। কিন্তু এখনো সতর্কতার জায়গা রয়ে গেছে। কারণ, সন্ত্রাসবাদী সংগঠন অভিযানে ভেঙে দেওয়া যায়; কিন্তু উগ্রবাদী মতাদর্শ, অনলাইন প্ররোচনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পরিচয়-সংকটের ভিত্তি ভাঙতে লাগে দীর্ঘমেয়াদি কাজ।

তাই ১০ বছর পর গুলশানের সেই রাত শুধু শোকের স্মৃতি নয়; রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য এখনো এক স্থায়ী সতর্কবার্তা।