সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও কাজী গুলশান আরা
সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও কাজী গুলশান আরা

সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগে মামলা দিল পুলিশ

সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্যমতে, গতকাল রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের পল্লবী জোনাল টিমের সদস্যরা এ অভিযান পরিচালনা করেন। বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে রাত আড়াইটার দিকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ডিবি পুলিশের একজন পরিদর্শক বাদী হয়ে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচার, তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ইউনিটি কেয়ার পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পলাতক শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, ‘কালআজকাল ডটকম’ নামের একটি পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কনটেন্ট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রচারের অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।

পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে অবৈধ অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারায় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা সহযোগীদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ নামের একটি কমিটি গঠন এবং ওই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে এজাহারে।

চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত আজ সোমবার সন্ধ্যায় শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ সাবেক সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলার অন্য আসামিদের নাম-ঠিকানা ও অবস্থান শনাক্ত করা, দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই, ডিজিটাল আলামত উদ্ধার, আসামিদের পরিচালিত অন্য কোনো ওয়েবসাইট বা পেজের সন্ধান এবং ঘটনার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন।

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে আসামি দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বিচারক এজলাসে আসেন। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে অংশগ্রহণ করে বৈঠকে তাঁরা দেশকে অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন কূটচক্রে যুক্ত হন। এ ছাড়া আরও নানাবিধ উপাদান পাওয়া গেছে। তাঁদের রিমান্ড আবেদন করছেন তিনি।

এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে বলেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ এই মামলার ২ নম্বর আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু কী কারণে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে? তাঁর অপরাধ কী? সেগুলোর কোনো বিষয়ই রিমান্ড আবেদনে নেই।

আর গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি একটা টক শোতে গিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু টক শোতে গিয়ে কী বক্তব্য দিলেন যে দেশে অস্থিতিশীল হয়ে গেল? এই এলিগেশন (অভিযোগ) করা হচ্ছে কিন্তু কী পেয়েছে তা কিছু বলা নেই। রিমান্ড আবেদনে কিছুই নেই আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার মতো।

তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ রিমান্ড চেয়ে বলেন, ‘আসামিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য নিয়মিত পতিত সরকারের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। এই আসামিদের সঙ্গে দেশি ও বিদেশি গুপ্তচরদের যোগাযোগ আছে। আমরা এই আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চাই। রিমান্ডে নিলে তাঁদের সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য জানা যাবে। তাঁদের কাদের কাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। নাশকতামূলক কী কী কর্মকাণ্ড করছে, তা জানা যাবে। তাঁদের রিমান্ডে নিলেই জানা যাবে তাঁদের পরিকল্পনা কী?’

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন।