রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কিশোরী গৃহকর্মীর মরদেহ ফেলে রেখে পালানো সেই গৃহকর্তা, তাঁর স্ত্রী ও শ্বশুরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।
কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন মো. ফয়সাল আহমেদ (৩৫), তাঁর স্ত্রী রাহেমা খাতুন রেশমা (২৯) এবং ফয়সালের শ্বশুর এ বি এম আবদুর রাজ্জাক (৪৭)।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম বলেন, আদালতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক মাহফুজা আক্তার আসামিদের আদালতে হাজির করে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান। আসামিদের পক্ষে কোনো জামিন আবেদন ছিল না। পরে আদালত অভিযুক্ত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তবে রিমান্ড আবেদন না থাকায় আসামিদের এজলাসে হাজির করা হয়নি।
নিহত গৃহকর্মীর নাম মীম আক্তার। তার বাড়ি কুমিল্লার বাঙ্গরা বাজার, আন্দিকুট গ্রামে। তিন বোনের মধ্যে সে সবার ছোট ছিল। তার বাবা ফজলু মিয়া মারা যাওয়ার পর তার মা শিপন বেগম আবার বিয়ে করেন। মীম হত্যার ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে মামলা করেন।
আদালতে পাঠানো পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, মীম আক্তার প্রায় এক বছর ধরে আসামিদের বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করে আসছিল। আসামিরা তাকে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। ফোন করলে মীম স্বজনদের কাছে কান্নাকাটি করে নির্যাতনের কথা জানাত। এ বিষয়ে আসামিদের কাছে জানতে চাইলে উল্টো মীমকে বাসা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিতেন। দারিদ্র্যের কারণে তাঁরাও মুখ বুজে বিষয়টি সহ্য করতেন। ১৩ আগস্ট সকালে মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল মীমের পরিবারকে ফোন করে জানান, মীম বাসা থেকে টাকাপয়সা চুরি করে অন্য একটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। বিষয়টি জানতে ১৭ আগস্ট মীমের পরিবার আসামিদের বাসায় গিয়ে মেয়ের বিষয়ে জানতে চায়। তখন আসামিরা তাঁদের মেয়ে পালিয়ে গেছে উল্লেখ করে বকাঝকা করে বের করে দেন। আসামিদের আচরণে বাদীর সন্দেহ হলে পরিবার নিয়ে মেয়েকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেন। ২০ আগস্ট বাঙ্গুরাবাজার থানান পুলিশের মাধ্যমে খবরে পেয়ে শাহবাগ থানার পুলিশের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেলের মর্গে গিয়ে শাহিন বেগম মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন।
পুলিশ জানায়, মামলা তদন্তকালে ১২ আগস্ট ঢামেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে অজ্ঞাতনামা ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানার পুলিশ। পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে। পরে পুলিশের একটি ডেডিকেটেড দল অভিযান চালিয়ে আসামিদের ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, মীমের মৃত্যুর পর অপরাধ ঢাকতে ও নিজেদের বাঁচাতে আসামিরা সুকৌশলে তার লাশ হাসপাতালে নিয়ে ফেলে রেখে পালিয়ে যান। ঘটনার পরপরই তাঁরা দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করা নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়ের ফ্ল্যাট ছেড়ে ডেমরার বামৈল এলাকায় সপরিবার আত্মগোপন করেন।
এদিকে শাহবাগ থানার পুলিশ জানায়, তারা ১২ আগস্টের হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। সেখানে দেখা গেছে, দুই ব্যক্তি কিশোরীটিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নিয়ে আসেন। পরে জরুরি বিভাগে নিয়ে এসে সেখানকার ট্রলিতে তুলে দিয়ে একজন টিকিট কিনার কথা বলে ও অপরজন ভাড়া দেওয়ার কথা বলে সেখান থেকে সটকে পড়েন।
শাহবাগ থানার এসআই মাহফুজা আক্তার ১৩ আগস্ট মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেলে কিশোরীর ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ প্রভাষক জাকিয়া তাসনিম। তিনি বলেন, কিশোরীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।