থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু-মহিষ দেশে আনত সাদিক অ্যাগ্রো লিমিটেড। ভুটান ও নেপাল থেকেও ছোট আকৃতির ‘ভুট্টি’ গরু এনে বিক্রি করত তারা। এসব পশুও আনা হতো চোরাই পথে।
শুধু তা–ই নয়। দেশি গরু-ছাগলকে ‘বিদেশি’ ও ‘উচ্চবংশীয়’ বলে প্রচার করে বেশি দামে বিক্রির তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) করা মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তে।
২০২৪ সালের ঈদুল আজহার আগে সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ১৫ লাখ টাকায় একটি ‘উচ্চবংশীয়’ ছাগল কিনে আলোচনায় আসেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান। ওই ঘটনার পর মতিউর রহমানের পাশাপাশি সাদিক অ্যাগ্রোর নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে।
চোরাচালান, প্রতারণা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ১৩৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মানি লন্ডারিং করার অভিযোগে দায়ের করা মামলাটির তদন্ত শেষ করেছে সিআইডি। আদালতে সিআইডির জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তদন্তে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬৬৮ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়া ব্রাহমা গরু আমদানি, প্রায় ৮৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচার, সরকারি খাল ও সড়ক দখল এবং গরু আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত ৯ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সিআইডি।
২০২৪ সালের ঈদুল আজহার আগে সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ১৫ লাখ টাকায় একটি ‘উচ্চবংশীয়’ ছাগল কিনে আলোচনায় আসেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান। ওই ঘটনার পর মতিউর রহমানের পাশাপাশি সাদিক অ্যাগ্রোর নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে।
এরপর ২০২৫ সালের ৩ মার্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় সাদিক অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান মো. ইমরান হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলমের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে সিআইডি। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে গত এপ্রিলে দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সংস্থাটি। ইমরান হোসেন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তৌহিদুল আলম পলাতক।
গবাদিপশু চোরাচালান
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত দিয়ে আনা গবাদিপশু দেশের বিভিন্ন খামার ও বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে বাজারজাত করা হতো। এসব গবাদিপশু কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে আনা হতো থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে। ভুটান ও নেপাল থেকেও ছোট আকৃতির ‘ভুট্টি’ গরু এনে বিক্রি করা হতো।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির আর্থিক অপরাধ বিভাগের পরিদর্শক মো. ছায়েদুর রহমান ১ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
এখনো অবৈধ দখল ছাড়েনি সাদিক অ্যাগ্রো। মোহাম্মদপুরে নবীনগর হাউজিংয়ে মূল সড়কের পাশেই সাদিক অ্যাগ্রোর গরুর খামার এবং মিষ্টি ও বেকারির দোকান। ১ জুলাই সরেজমিনে দেখা যায়, খাল ও সড়কের জায়গা এখনো সাদিক অ্যাগ্রোর দখলে রয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালে সাদিক অ্যাগ্রো যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০টি গাভিন ব্রাহমা হিফার গরু আমদানির অনুমতি চেয়েছিল। জাতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালার কারণে সেই আবেদন বাতিল হয়। এরপর অনুমোদন ছাড়াই ১৮টি ব্রাহমা গরু দেশে আনা হয়।
এ জন্য বিমানবন্দরের লাইভস্টক কোয়ারেন্টিন স্টেশনের এক কর্মকর্তার সই জাল করে ভুয়া আমদানি অনুমতিপত্র তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (বাজেট) এ বি এম খালেদুজ্জামান সিআইডির করা মামলার ১০ জন সাক্ষীর একজন। আজ সোমবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিমানবন্দরের লাইভস্টক কোয়ারেন্টিন স্টেশনের কর্মকর্তার সই জাল করে সাদিক অ্যাগ্রো ব্রাহমা গরু আমদানি করেছিল। মামলার তদন্তকালে সিআইডি তাদের কাছে এ-সংক্রান্ত যে তথ্য চেয়েছিল, সেটা সরবরাহ করা হয়েছে।
সীমান্ত দিয়ে আনা গবাদিপশু দেশের বিভিন্ন খামার ও বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে বাজারজাত করা হতো। এসব গবাদিপশু কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে আনা হতো থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে। ভুটান ও নেপাল থেকেও ছোট আকৃতির ‘ভুট্টি’ গরু এনে বিক্রি করা হতো।
খামারে এখনো দেশি–বিদেশি গরু
ছাগল–কাণ্ডের পর ২০২৪ সালের ২৭ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) খাল ও সড়কের জায়গায় তৈরি করা সাদিক অ্যাগ্রোর স্থাপনায় উচ্ছেদে অভিযান চালায়। তবে এরপরও অবৈধ দখল ছাড়েনি সাদিক অ্যাগ্রো। মোহাম্মদপুরে নবীনগর হাউজিংয়ে মূল সড়কের পাশেই সাদিক অ্যাগ্রোর গরুর খামার এবং মিষ্টি ও বেকারির দোকান। ১ জুলাই সরেজমিনে দেখা যায়, খাল ও সড়কের জায়গা এখনো সাদিক অ্যাগ্রোর দখলে রয়েছে।
গরুর খামারের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের খামারে দেশ–বিদেশি ১০০টির মতো গরু রয়েছে। দায়িত্বশীল কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, মালিক জেলে রয়েছেন। যাঁকে ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তিনিও এখন নেই।