রাজধানীর সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহীম পলাশকে (৩২) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে কেউ গ্রেপ্তার হননি। হত্যাকারীরা ইব্রাহীমের দুই হাতের বিচ্ছিন্ন কবজি নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ প্রতিশোধ, নাকি মাদকের ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব, তা নিয়ে পুলিশ কাজ করছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাত সোয়া আটটার দিকে সবুজবাগের বাগপাড়া পানির পাম্পসংলগ্ন এলাকায় ইব্রাহীম পলাশকে রামদা ও চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে একদল দুর্বৃত্ত। এতে তাঁর দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাঁর বুকেও আঘাত করে হামলাকারীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ইব্রাহীমের বড় বোন মামলা করেছেন।
ইব্রাহীম লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আবুল বাশারের ছেলে। পেশায় প্রাইভেট কারের চালক ইব্রাহীম সবুজবাগের ৭১ নম্বর মাদারটেক এলাকায় থাকতেন।
সিসিটিভিতে হামলার দৃশ্য
ঘটনার একটি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, রাত আটটার দিকে বাগপাড়া পানির পাম্পসংলগ্ন সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে ১৫-২০ জন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলছিলেন ইব্রাহীম। রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে চাপাতি ও রামদা হাতে এক ব্যক্তি সেখানে এসে তাঁকে কোপাতে শুরু করেন। প্রথম আঘাতের পর ইব্রাহীম দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে হামলাকারীরা পিছু ধাওয়া করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ফুটেজে যাঁকে প্রথম হামলা করতে দেখা গেছে, তাঁর নাম মোস্তফা হোসেন রয়েল (৩৭)। তিনি সবুজবাগের ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ফুটেজে মো. সবুজ (২৮), শফিক নামের আরও দুজনকে দেখা গেছে। তাঁরা মোস্তফার সহযোগী। ইব্রাহীমও স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যদিও তাঁর কোনো সাংগঠনিক পদ ছিল না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে থেকে ধাওয়া করে হামলাকারীরা ইব্রাহীমকে পাশের একটি গলিতে নিয়ে যান। সেখানে কুপিয়ে তাঁর দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে তাঁরা নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পুলিশ এখনো সেই বিচ্ছিন্ন কবজিগুলো উদ্ধার করতে পারেনি।
মা–বাবার মারধরের প্রতিশোধ নিতে হত্যা
সবুজবাগ থানা–পুলিশ সূত্র বলছে, নিহত ইব্রাহীম এবং আসামি মোস্তফা পূর্বপরিচিত। দুজনই স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক কোনো বিরোধের কারণে এই হত্যাকাণ্ড হয়নি। ইব্রাহীম স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বিচার–সালিসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হত্যার আগেও তিনি ওই গলিতে একটা সালিসে ছিলেন। সালিসের একপর্যায়ে সেখানেই তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
হত্যার কারণ প্রসঙ্গে পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের তিন দিন আগে সবুজবাগে চুরি যাওয়া একটি মুঠোফোন নিয়ে মোস্তফার সঙ্গে ইব্রাহীমের হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে মারামারি হয়। সেখানে থাকা মোস্তফার মা–বাবাকে মারধর করেন ইব্রাহীম। তখন ইব্রাহীমের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন মোস্তফা। এ কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে কাউকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছে না পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরেকটি সূত্র বলছে, মোস্তফা ও ইব্রাহীম স্থানীয়ভাবে মাদক কারবারের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়েও তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। সেই দ্বন্দ্বের কারণেও হত্যা করা হতে পারে। দুটি বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করছে তারা। ঘটনার বিষয়ে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পূর্ববিরোধের কারণে হত্যা হয়েছে বলে তাদের ধারণা। আসামি ও হাতের কাটা অংশগুলো উদ্ধারে জোর চেষ্টা করছেন তাঁরা। দ্রুতই এই মামলার অগ্রগতি হবে।
হত্যা মামলা, আসামি সাত-আটজন
ঘটনার পর নিহত ইব্রাহীমের বড় বোন জোছনা বেগম বাদী হয়ে সবুজবাগ থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় মোস্তফা, সবুজ ও শফিককে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
জোছনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ডান হাতের কবজি থেকে আর বাঁ হাতের কনুইয়ের নিচ থেকে কেটে নিয়েছে। এখনো পুলিশ হাতের কাটা অংশ খুঁজে পায়নি। এত নির্মমভাবে কেউ কাউকে হত্যা করতে পারে না। সিসিটিভিতে আসামিদের চেহারা স্পষ্ট দেখা গেছে; কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আমরা দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার চাই।’
দুজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে মামলা
সবুজবাগ থানা–পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইব্রাহীম পলাশ হত্যার প্রধান আসামি মোস্তফা দীর্ঘদিন ধরে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে চুরি, চাঁদাবাজি, মারধর, হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সবুজবাগ থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ জুন তাঁর বিরুদ্ধে একটি হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, নিহত ইব্রাহীমের বিরুদ্ধেও হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে। গত বছরের ১৬ এপ্রিল সবুজবাগ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যুবলীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইব্রাহীম। সরকার পতনের পর স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। তবে কোনো পদ–পদবি ছিল না তাঁর। বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অপরাধের সালিস করতেন তিনি।