খুন
খুন

তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে দলীয় ১৫ নেতা-কর্মী খুন

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই দুর্বৃত্তের গুলির নিশানা হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। তাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দেয় উদ্বেগ। ভোটের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার কথা বলা হলেও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটছে না। হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, তফসিল ঘোষণার পর গত ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা–কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মীই বেশি। আর হত্যাকাণ্ডগুলোর বেশির ভাগই ঘটেছে অবৈধ অস্ত্রে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ‘প্রস্তুত’ থাকার কথা বললেও ভোটের আগে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না রাজনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকেরা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হবে, ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামবেন প্রার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন অবস্থায় একের পর এক হত্যার ঘটনা এবং অনেক ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখনই যদি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কারণে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রার্থীদের অনেকে শঙ্কিত হয়ে পুলিশি নিরাপত্তাও চান, কেউ কেউ তা পেয়েছেনও।

শহীদ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজের রহমান ওরফে মোছাব্বিরকে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর এক সমর্থককে।

গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর এক মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১২ জন। অন্য তিনজনের মধ্যে শহীদ ওসমান হাদি ছাড়া রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী এবং নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের এক নেতা। এঁদের ছয়জনকে গুলিতে, চারজনকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এবং বাকি পাঁচজনকে ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ অধিকাংশ খুনই হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে।

গুলি করে হত্যা, অস্ত্র উদ্ধার নেই

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজের রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। পুলিশ বলছে, তাঁরা ভাড়াটে খুনি। এই চারজনের মধ্যে একজন ‘শুটার’ বলেও জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার নেপথ্যে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম এসেছে। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি এখনো। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি।

প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তফসিলের পর রাজনৈতিক সংগঠনের যে ১৫ জন খুন হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৪টি ঘটনায় পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। শুধু গত ২৪ ডিসেম্বরে গাজীপুরের শ্রীপুরের গোসিংগা ইউনিয়নে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) নেতা ফরিদ সরকারকে (৪১) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে ১৫ জনের মধ্যে ৬ জনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হলেও এর মধ্যে শুধু ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে এ ক্ষেত্রে মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির নেতা-কর্মীরা খুন হয়েছেন মূলত আধিপত্য বিস্তার, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে স্থানীয় প্রতিপক্ষের হাতে। এর মধ্যে ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানের পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাটে উপজেলা যুবদলের সদস্য মুহাম্মদ জানে আলমকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গিয়াস কাদের চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির দুই প্রার্থীর একজন।

গতকাল সন্ধ্যায় ধোবাউড়ায় মো. নজরুল ইসলাম (৪০) নামে যিনি নিহত হন, তিনি ময়মনসিংহ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের কর্মী। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় তিনি নিহত হন।

পুলিশ ‘প্রস্তুত’, তবে উদ্বেগ কাটছে না

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ পূর্ববিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও হঠাৎ সংঘটিত সহিংসতার ফল। পুলিশ প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত করছে, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

নির্বাচনের আর ২৬ দিন বাকি থাকতে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলেই মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব নিতে হবে। কোনো সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নীরব না থেকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।