আবেদনে সুপারিশ নিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর দপ্তরের সামনের করিডরে অপেক্ষা। ঢাকা, ৭ অক্টোবর
আবেদনে সুপারিশ নিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর দপ্তরের সামনের করিডরে অপেক্ষা। ঢাকা, ৭ অক্টোবর

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম ওঠাতে অনেক আবেদন

বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম তুলতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনেক আবেদন জমা পড়েছে। বুধবার ছিল তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদনের শেষ দিন। এদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত অন্তত কয়েক শ মানুষকে আবেদন করতে দেখা যায়। সচিবালয়ের উল্টো দিকে পরিবহন পুল ভবনে মন্ত্রণালয়ের সামনে ছিল ব্যাপক ভিড়। তবে কতজন আবেদন করেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন কয়েক বছর ধরে চলে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ আবেদন নেওয়া অব্যাহত ছিল। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) বৈঠকে গেজেটভুক্তির সুপারিশ করা হতো। সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করত।

তবে ১ অক্টোবর মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তাতে বলা হয়, ৭ অক্টোবরের পর বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন আর নেওয়া হবে না। এ বিজ্ঞপ্তির পর সারা দেশ থেকে তালিকায় নাম তোলার চাপ শুরু হয়। মূলত ২ অক্টোবর থেকে আবেদনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বুধবার শেষ দিন হওয়ায় আবেদনের চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি।

যশোর থেকে গেজেটভুক্তির আবেদন করতে এসেছিলেন আলতাফ হোসেন। বয়স ৭৩। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগেও তিনি গেজেটভুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

মানিকগঞ্জ থেকে এসেছেন ৭৫ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। এখন কেন আবেদন করতে এসেছেন, জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যতবার আবেদন করেছেন, ততবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁর নাম গেজেটভুক্ত করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

চাঁদপুর থেকে আবেদন করতে এসেছেন হায়দার খান। তিনি বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল আগে তাঁর নাম গেজেটভুক্ত করতে দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সব প্রমাণ থাকার পরও বারবার তাঁর নাম কেটে দেওয়া হতো বলে দাবি করেন তিনি।

বিকেলে মন্ত্রণালয়ের নিচতলায় গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে পুলিশের দুজন সদস্য বিভিন্নজনের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করছেন। নিচে অনেক আবেদন। কিছুক্ষণ পরপর এসব আবেদন ভবনের পঞ্চম তলায় মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে আবেদনে মন্ত্রীর সুপারিশসংবলিত সই দেওয়া হচ্ছে। পরে সেই আবেদন আবেদনকারীকে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আবেদনকারীরা তা নিয়ে জামুকায় জমা দেন।

পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, মন্ত্রীর দপ্তরে আবেদন হাতে অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায়। মন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সবাই মন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে আবেদন জামুকায় জমা দেন। মন্ত্রীর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রীর কক্ষে প্রচুর আবেদন জমা পড়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে মন্ত্রীর দপ্তর থেকে সুপারিশ করা আবেদন ছেড়ে দেওয়া হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন জমা দিতে ভিড়। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একের পর এক আবেদন নেওয়া হচ্ছে। পরিবহন পুল ভবন, সচিবালয়ের উল্টো দিকে, ঢাকা, ৭ অক্টোবর

কয়েকটি আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবেদনকারীরা নিজেদের বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, সে তথ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণ যুক্ত করেছেন। আগে বিভিন্ন সময়ে আবেদন করেও রাজনৈতিক কারণে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এদিকে দুপুরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, ৭ অক্টোবরের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নতুন করে আর কোনো আবেদন নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এখন কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুন করে আবেদন নেওয়া হবে? বিষয়টি স্বাধীনতার পর দু-এক বছরের মধ্যেই শেষ হওয়া উচিত ছিল।

যাঁরা এরই মধ্যে আবেদন করেছেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, কেউ বাদ পড়ে থাকলে, যতজনই আবেদন করুন না কেন, যাচাই করে তাঁদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ কাজ দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে করা হবে।

নতুন করে কতজন গেজেটভুক্তির আবেদন করেছেন, তা এখনই জানা যাবে না বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

অবশ্য মন্ত্রণালয়ের নিচে উপস্থিত একাধিক মুক্তিযোদ্ধা প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া শুরুর পর থেকে তালিকায় নাম তোলার চাপ বাড়তে থাকে। তখন থেকেই অমুক্তিযোদ্ধারা তালিকায় ঢুকতে শুরু করেন। এবার যাতে কোনো অমুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ঢুকতে না পারেন, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।