
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ জনগণকে নির্যাতন করার শক্তিকে সাংবিধানিক ক্ষমতা হিসেবে ভেবে নিয়েছিল। জনগণের ইচ্ছাকে তারা মূল্য দিত না, বরং নির্যাতন করার ক্ষমতাকেই নিজেদের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিল।
মঙ্গলবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে ‘রেভল্যুশনারি কনস্টিটিউশনালিজম অ্যান্ড হোয়াই ইট ওয়াজ এসেনশিয়াল টু ডিক্লেয়ার দ্য ফিফটিনথ অ্যামেন্ডমেন্ট আনকনস্টিটিউশনাল’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে তিনি এ কথা বলেন।
বইটির লেখক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরিফ ভূঁইয়া। বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এ সময় বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ যা ইচ্ছা তাই করেছে, এমন মন্তব্য করে আসিফ নজরুল বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছিল সব সময় জিয়াউর রহমানকে গালাগালি করা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে পৃথিবীর সকল কিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের সময় শেখ হাসিনা অনেক ক্ষেত্রে শেখ মুজিবকে বাদ দিয়ে জিয়াউর রহমানকে বেছে নিয়েছিলেন।
উদাহরণ দিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানে অবসরোত্তর বিচারকদের সরকারি চাকরিতে যোগদানের বিধান ছিল না, সেটি প্রবর্তন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলও তাঁর প্রবর্তিত একটি প্রতিষ্ঠান। শেখ হাসিনা যদিও প্রকাশ্যে জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করতেন, তবু অসংখ্য বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবর্তে তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন।
আসিফ নজরুল বলেন, জনগণের ইচ্ছা নয়, বরং জনগণকে নির্যাতন করার শক্তিকেই তারা সাংবিধানিক ক্ষমতা মনে করত। জনগণের ইচ্ছার কোনো গুরুত্ব তাদের কাছে ছিল না।
পঞ্চদশ সংশোধনীকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমার মনে হতো, এমন এক সাংবিধানিক সংশোধনী আওয়ামী লীগের লোকজন কি এতটাই বোকা হয়ে করেছে, নাকি উদ্ধত হয়ে? আমার মনে হয় তারা উদ্ধতই ছিল। তারা ভেবেছিল, তাদের ক্ষমতা এতই অটল যে একটি নির্যাতন যন্ত্র চালু করলেই জনগণ মুখ খুলতে পারবে না।’
অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন। শরিফ ভূঁইয়ার লেখা বইটির প্রশংসা করেন তিনি। এ সময় কয়েকজন দার্শনিককে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সরকার নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে জনগণের দায়িত্ব তাকে উৎখাত করা। বাংলাদেশের জনগণ নিপীড়ক সরকারকে উৎখাত করেছে।
আবদুল মতিন বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকে বিপ্লব বলা হবে নাকি অভ্যুত্থান, তা নিয়ে অনেক দিন ধরে কথা হচ্ছে। যে বিপ্লবে বায়তুল মোকাররমের খতিবকে পালিয়ে যেতে হয়, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দলবলসহ পালিয়ে যেতে হয়, সেটাকে বিপ্লব ছাড়া কী বলা হবে।
পঞ্চদশ সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণার দাবিতে বাদী হিসেবে আদালতে মামলা করেছিলেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। আলোচনায় পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের মামলাসহ বিভিন্ন মামলার সময়কার স্মৃতিচারণা করেন তিনি। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তাঁর মনে হয়েছিল একটি সংসদ ভবিষ্যৎ সংসদের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে না। ভবিষ্যতের যেকোনো বিকাশকে এটি রুদ্ধ করবে। ২০১৩ সালে তিনি লিখেছিলেন পঞ্চদশ সংশোধনীর নৈতিক ভিত্তি নয়, এর আইনি বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ।
বইয়ের লেখক শরিফ ভূঁইয়া বলেন, বর্তমান সরকারের আইনত ভিত্তি কী, এ সরকার কত দিন থাকতে পারবে এবং স্পিকার পদত্যাগের পর সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির আলোচনা—এই তিন সময়ের লেখাগুলো একসঙ্গে করে বইটির তিনটি অধ্যায় তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলা নিয়ে কাজ করার বিষয়গুলোও বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চেয়ার অব দ্য সেশন ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে সংবিধান ছিঁড়ে ফেলা এবং সংবিধান পুনর্লিখনের কথা শোনা যাচ্ছে। নতুন সংবিধান না পেলে নির্বাচন করতে পারব না, এগিয়ে যেতে পারব না, এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ। যাঁরা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁদের আগে সংবিধানটি পড়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দীন। আরও বক্তব্য দেন বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি এমদাদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক, লেখক ও অনুবাদক মিল্লাত হোসেন প্রমুখ।