সুপ্রিম কোর্ট
সুপ্রিম কোর্ট

নজরুল ইসলাম মজুমদারের নামে গুলশানের ২২ কাঠার প্লট হস্তান্তরের রায় বাতিল

রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ২২ কাঠার একটি প্লটের মালিকানা এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের অনুকূলে হস্তান্তরের হাইকোর্টের রায় বাতিল করেছেন আপিল বিভাগ। ৯ বছর আগে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সোমবার এ রায় দেন।

এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড ওই আপিল করেছিল। আইনজীবীরা বলছেন, রায়ে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে নজরুল ইসলাম মজুমদারের নামে ওই সম্পত্তি রেজিস্ট্রি এবং পরবর্তী সময়ে একই সম্পত্তির সব ধরনের হস্তান্তর ও নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত মালিকের কাছে সম্পত্তি ফেরার পথ সুগম হলো।

নথিপত্র থেকে জানা যায়, গুলশানের আজাদ মসজিদ–সংলগ্ন রোড-৩৬-এর সিডব্লিউএন (বি) ব্লকের ৩৩ নম্বর প্লট। সেখানে জায়গার পরিমাণ ২২ কাঠা ২ ছটাক।

রায়ের বিষয়টি মঙ্গলবার জানান আপিলকারীপক্ষের অন্যতম জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশনের একটি ঋণ ছিল। নজরুল ইসলাম মজুমদার জালজালিয়াতি করে ওই ঋণ পরিশোধ দেখিয়ে ওই জমি নিজের নামে হস্তান্তর করে নেন। তাঁর অনুকূলে ওই সম্পত্তি হস্তান্তরে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বাতিল করেছেন আপিল বিভাগ। ২০১২ সাল থেকে ওই সম্পত্তির সব ধরনের হস্তান্তর–নিবন্ধনও বাতিল করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত মালিকের কাছে ওই সম্পত্তি ফেরার পথ সুগম হলো।

আইনজীবীদের তথ্যমতে, ১৯৯০-এর দশকে ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে এ আর এ জুট ট্রেডিং করপোরেশন অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ঋণখেলাপি হওয়ায় ব্যাংক সম্পত্তিটি বিক্রির উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীকালে একটি ভুয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) তৈরি করে নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেন এবং অগ্রণী ব্যাংক তাঁর নামে সম্পত্তিটি রেজিস্ট্রির সিদ্ধান্ত নেয়।

ওই কোম্পনির নেওয়া ঋণের বিপরীতে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে জমিটি বন্ধক অবস্থায় জাল দলিল দিয়ে ওই সম্পত্তি বেচাকেনার অভিযোগ ওঠে। প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় ওই সম্পত্তি নিয়ে নজরুল ইসলাম মজুমদার রিট করেন। রিটের ওপর ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে ১৫ দিনের মধ্যে ওই সম্পত্তি নজরুল ইসলাম মজুনদারের অনূকূলে হস্তান্তর দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আপিলকারীপক্ষের আইনজীবীর তথ্যমতে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশনের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল কবির খান আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। লিভ মঞ্জুরের পর আপিল করা হয়। তবে ২০১৮ সালে তাঁকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আদালতে এনে মামলা প্রত্যাহারে (আপিল তুলে নেওয়া) বাধ্য করার অভিযোগ করেন তিনি। নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দেশত্যাগ করেন তিনি।

আপিলকারীপক্ষের আইনজীবীর তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরে এসে গুম কমিশনেও অভিযোগ করেন আনোয়ারুল কবির খান। জোরপূর্বক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করে আপিল বিভাগে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেন তিনি। এর ধারাবাহিকতায় এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশনের আপিলের ওপর শুনানি শেষে সোমবার রায় দেওয়া হয়।

আদালতে আপিলকারীপক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আহসানুল করিম ও আইনজীবী আনিসুল হাসান শুনানিতে ছিলেন। নজরুল ইসলাম মজুমদারের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী ও সৈয়দ মামুন মাহবুব। ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শামীম খালেদ আহমেদ।

হাইকোর্টের রায় বাতিল হয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম মজুমদারের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে যেসব চুক্তি হয়েছে, সব বাতিল করেছেন আদালত। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবর নজরুল ইসলাম মজুমদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ছিলেন। নজরুল ইসলাম মজুমদার এখনো কারাগারে বন্দী।