বিক্ষোভকারীদের দমাতে উড়ছে র‍্যাবের হেলিকপ্টার। ২০২৪ সালের ২২ জুলাই রাজধানীর মাতুয়াইলে
বিক্ষোভকারীদের দমাতে উড়ছে র‍্যাবের হেলিকপ্টার। ২০২৪ সালের ২২ জুলাই রাজধানীর মাতুয়াইলে

এসএমজি-শটগান নিয়ে আকাশে ওড়ে র‍্যাবের হেলিকপ্টার

দিন যত গড়াচ্ছিল, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের তীব্রতা তত বাড়ছিল। ওই পরিস্থিতিতে সরকারি অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি র‍্যাবও আন্দোলনকারীদের রাজপথ থেকে পিছু হটাতে বলপ্রয়োগ করে। জুলাইয়ের ১৯, ২০ ও ২১ তারিখ—এই তিন দিন রাজধানীর আকাশে ওড়া র‍্যাবের হেলিকপ্টারে তোলা হয়েছিল এসএমজি (সাবমেশিন গান), শটগান ও গ্যাসগান। এসব আগ্নেয়াস্ত্রের গোলাবারুদসহ সাউন্ড গ্রেনেড তোলা হয়েছিল। আন্দোলন দমাতে সেসব হেলিকপ্টার থেকে গ্যাসগান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রাথমিক তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তানভীর হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হেলিকপ্টার থেকে এসএমজি ও শটগান দিয়ে গুলি করার বিষয়টিও তাঁরা তদন্ত করছেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ওই তিন দিন (২০২৪ সালের ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই) র‍্যাবের হেলিকপ্টারে ৩ হাজার ৫৫৫টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২টি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দমন–পীড়নের ঘটনা তদন্ত করছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ওই তিন দিন (২০২৪ সালের ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই) র‍্যাবের হেলিকপ্টারে ৩ হাজার ৫৫৫টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২টি।

প্রসিকিউশন তদন্তে জানতে পেরেছে, সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ১৮ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা শহরের চারপাশে হেলিকপ্টার ওড়ানো হয়। ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই হেলিকপ্টারে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তোলা এবং সেগুলো ব্যবহার করার তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডি ১ নম্বরে বাসার ছাদে উঠে রেহেনা আক্তারের বড় ছেলে আইমান উদ্দিন (২৪) ও ননদ নাসিমা আক্তার (২৪) গুলিবিদ্ধ হন। রেহেনা আক্তার গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, কেউ বলছে সেদিন হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছিল, কেউ বলছে ছাদ থেকে গুলি করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার দেওয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে র‍্যাবের পক্ষ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হেলিকপ্টার ওড়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। সেই হেলিকপ্টারে কারা ছিলেন, সেই তথ্য তদন্ত সংস্থা উদ্ধার করতে পেরেছে।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় রেহেনা আক্তার বলেন, ওরা (আইমান ও নাসিমা) যখন বাসায় ছিল, তখন তিনি হেলিকপ্টার উড়তে দেখেন। এর কয়েক মিনিট পর ওরা ছাদে ওঠে। ছাদে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওদের গায়ে গুলি লাগে।

আইমানের বুকের ডান পাশে গুলি লেগে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। নাসিমার গায়েও গুলি লাগে। দ্রুত তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ২০ জুলাই নাসিমা মারা যান। আইমান চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে মাঝেমধ্যে তাঁর শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা হয়।

হেলিকপ্টারে অস্ত্র তোলা ও ব্যবহার

বিশেষজ্ঞরা জানান, শটগান থেকে রাবার বুলেট বা সিসার গুলি ছোড়া হয়। গ্যাসগান থেকে নিক্ষেপ করা হয় কাঁদানে গ্যাসের শেল। সাউন্ড গ্রেনেডের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি করা হয়। শটগান, গ্যাসগান ও সাউন্ড গ্রেনেড সাধারণত প্রাণঘাতী নয়। তবে এসএমজি প্রাণঘাতী। এর মাধ্যমে লাইভ বুলেট (তাজা গুলি) ছোড়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার দেওয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে র‍্যাবের পক্ষ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হেলিকপ্টার ওড়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। সেই হেলিকপ্টারে কারা ছিলেন, সেই তথ্য তদন্ত সংস্থা উদ্ধার করতে পেরেছে।

র‍্যাবের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকা শহরের চারপাশে র‍্যাবের হেলিকপ্টার উড়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য সেদিন হেলিকপ্টারে ১৩টি শটগান, ১৩টি গ্যাসগান ও ৪টি এসএমজি তোলা হয়েছিল। সাউন্ড গ্রেনেড তোলা হয়েছিল ৩৪০টি। শটগানের জন্য ২৬০টি, গ্যাসগানের জন্য ৫৫৮টি এবং এসএমজির জন্য ২৪০টি গোলাবারুদ তোলা হয়। গ্যাসগান থেকে ২১৮টি গোলাবারুদ ছোড়া হয় এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয় ১২২টি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেলিকপ্টার যাত্রাবাড়ী থানার ওপর দিয়ে রায়েরবাগ পর্যন্ত খুব নিচ দিয়ে বারবার ওড়ে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দ শোনা যায়। ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাসের শেল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেদিন রাতে উত্তরার জমজম টাওয়ারের কাছে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। এর পরদিন শনিবার প্রথম আলোর প্রথম পাতায় এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন রাজধানীর রামপুরা, সায়েন্স ল্যাব ও নিউমার্কেট এলাকায় র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, সাতমসজিদ রোডে ও চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। এ ছাড়া মহাখালী ও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায়ও হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ২০ জুলাই ছাত্র–জনতার আন্দোলন দমনে চারটি শটগান, ৯টি গ্যাসগান, একটি এসএমজি হেলিকপ্টারে তোলা হয়েছিল। শটগানের জন্য ৮০টি, গ্যাসগানের জন্য ৬৮৪টি এবং এসএমজির জন্য ৬০টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল। সাউন্ড গ্রেনেড তোলা হয়েছিল ২০০টি। ওই দিন হেলিকপ্টার থেকে গ্যাসগান দিয়ে ৫১২টি গোলাবারুদ ছোড়া হয়। এ ছাড়া সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয় ১৫২টি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেলিকপ্টার যাত্রাবাড়ী থানার ওপর দিয়ে রায়েরবাগ পর্যন্ত খুব নিচ দিয়ে বারবার ওড়ে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দ শোনা যায়। ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাসের শেল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেদিন রাতে উত্তরার জমজম টাওয়ারের কাছে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়।

বিচারাধীন একটি প্রক্রিয়ার ভেতর থাকায় এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রাইব্যুনাল থেকে যখন যে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, যে চিঠি দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা সাধ্যমতো সেটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এবং সংস্থাটির মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী

তদন্ত সূত্রে আরও জানা যায়, ২১ জুলাই আন্দোলন দমনে র‍্যাবের হেলিকপ্টারে একটি শটগান, ৮টি গ্যাসগান ও একটি এসএমজি তোলা হয়। সাউন্ড গ্রেনেড তোলা হয়েছিল ৪০০টি। শটগানের জন্য ২০টি, গ্যাসগানের জন্য ৬৫৩টি এবং এসএমজির জন্য ৬০টি গোলাবারুদ তোলা হয় হেলিকপ্টারে। ছাত্র–জনতার ওপর সেদিন হেলিকপ্টার থেকে গ্যাসগান দিয়ে ২৫৫টি গোলাবারুদ ছোড়া হয়। সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয় ২৮৩টি।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ২১ জুলাই ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এবং সংস্থাটির মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরীর কাছে। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিচারাধীন একটি প্রক্রিয়ার ভেতর থাকায় এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রাইব্যুনাল থেকে যখন যে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, যে চিঠি দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা সাধ্যমতো সেটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

‘হেলিকপ্টারে কারা ছিলেন, জানা গেছে’

চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে র‍্যাব প্রথমে জানিয়েছিল, গণ–অভ্যুত্থানের ওই সময় ঘটনার আকস্মিকতায় ও জরুরি পরিস্থিতির কারণে হেলিকপ্টার উড্ডয়ন–সম্পর্কিত তথ্য তারা নথিভুক্ত করেনি।

তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান বলেন, স্বল্পউচ্চতায় চলাচল করায় হেলিকপ্টারের আরোহীদের মুঠোফোন নম্বর বিটিএসে (বেজ ট্রান্সসিভার টাওয়ার) শনাক্ত হয়। সেসব মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বরের তালিকা ধরে হেলিকপ্টারে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন তাঁরা। এরপর সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাবের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। এরপর হেলিকপ্টারে কী কী অস্ত্র তোলা হয়েছিল এবং কী কী গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা জানায় র‍্যাব।

ওই সময় পর্যায়ক্রমে যে ২০ জনের বেশি ব্যক্তি র‍্যাবের হেলিকপ্টারে দায়িত্বপালন করেছিলেন, তাঁদের নামের তালিকাও উদ্ধার করতে পেরেছেন বলে জানান তানভীর হাসান।