চা এসেছে দেড় শতাধিক বছরের এক দীর্ঘ ইতিহাসের পথ ধরে। এই চায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের শ্রম, ত্যাগ, গবেষণা, ভালোবাসা।

চা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পছন্দের পানীয়। চা পান করেই অনেকের দিন শুরু হয়। এই অঞ্চলে সেই চা এসেছে দেড় শতাধিক বছরের এক দীর্ঘ ইতিহাসের পথ ধরে। এই চায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের শ্রম, ত্যাগ, গবেষণা, ভালোবাসা।
নতুন নতুন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে চায়ের উৎপাদন, গুণাগুণ ও ঘ্রাণে যুক্ত হয়েছে নতুন সব মাত্রা। বেড়েছে উৎপাদন। দৃষ্টি এখন চা-রপ্তানির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা ও চায়ের গুণগত মান আরও বৃদ্ধির দিকে।
চা এমন একটা শিল্প, রাতারাতি কিছু সম্ভব নয়। প্ল্যান, ইমপ্লিমেন্ট ও বাজারজাত করতে হয়।মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা-বোর্ড
‘চা দিবসের সংকল্প সমৃদ্ধ চা–শিল্প’ স্লোগানে আজ শনিবার ৪ জুন জাতীয় চা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান সূচির মধ্যে আছে শোভাযাত্রা, চা প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা। প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন সিলেট ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান জি এম শিবলী উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ।
বাংলাদেশ চা-বোর্ড, বাংলাদেশ চা-গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), চা-গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চা-গাছ একটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘ক্যামেলিয়া সাইনেসিস’। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু। পরে নতুন নতুন বাগান চা উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। ১৯৭০ সালে ছিল ১৫০টি চা-বাগান। তখন চা উৎপাদিত হতো ৩১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন কেজি। বর্তমানে দেশে ১৬৭টি চা-বাগান। ২০২১ সালে চায়ের উৎপাদন হয়েছে ৯৬ দশমিক ৫০ মিলিয়ন কেজি। ধারাবাহিকভাবে চায়ের চাহিদা যেমন বেড়েছে, বেড়েছে উৎপাদনও। এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিশাল চা-জনগোষ্ঠী যুক্ত। সেই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে চায়ের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধির কাজও চলছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বিটিআরআই এ পর্যন্ত উচ্চফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুণগত মানসম্পন্ন ২৩টি ক্লোন চা উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবন করেছে বীজ থেকে বাইক্লোনাল আরও পাঁচ ধরনের চা।
ক্লোন চায়ের মধ্যে সর্বশেষ ২০২১ সালের ৪ জুন বিটি-২২ ও বিটি-২৩ জাতের দুটি ক্লোন অবমুক্ত হয়। এর মধ্যে বিটি-২২ জাত হচ্ছে উচ্চফলনশীল, উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন। এ দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই। এর ‘স্ট্রাইকিং রেট’, অর্থাৎ নার্সারিতে চারা টিকে থাকার ক্ষমতা শতভাগ। এটি ব্ল্যাক টির জন্য একটি সেরা জাত। অপর দিকে বিটি-২৩ একটি খরা প্রতিরোধী, সুরভি বা সুগন্ধি ক্লোন জাত চা। সেচব্যবস্থা না থাকলেও এই চা ভালোভাবে টিকে থাকতে পারবে। নার্সারিতে টিকে থাকার ক্ষমতা এই চায়েরও শতভাগ। এটি অর্থডক্স ও হোয়াইট চায়ের জন্য একটি সেরা জাত। দুটি জাতেরই চারা রোপণের তিন বছর পর পাতা তোলা যাবে। এগুলো আগের বিটি ক্লোন থেকে উন্নত জাতের। প্রতি হেক্টরে এই জাতের উৎপাদন ৩ হাজার ২০০ কেজি। বিটি-২২ ও বিটি-২৩ জাতের চায়ের মাতৃবৃক্ষ তৈরির জন্য দেশের ৮০টি চা-বাগানে চারা সরবরাহ করা হয়।
বিটিআরআই সূত্র জানায়, গবেষণার পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের ক্লোন টি আছে, যা অবমুক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে আরও উন্নত মানসম্পন্ন চা। খরার মধ্যেও ভালোভাবে টিকে থাকার উপযোগী খরা প্রতিরোধী চা। জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু চা, যা চা-বাগানের স্যাঁতসেঁতে, পানি জমে থাকে, এমন জমিতেও চাষ করা যাবে। এ ছাড়া আছে গ্রিন টি। আগামী বছর চা দিবসে এসব ক্লোনজাত চা অবমুক্ত করার সম্ভাবনা আছে।
বিশ্বে আট রকমের চা আছে। বাংলাদেশে আছে ছয় জাতের। এই জাতের মধ্যে আছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্ল্যাক টি। এরপর গ্রিন টি, যা ২০১৬ সাল থেকে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে বাজারজাত শুরু হয়। ঔষধি গুণসম্পন্ন হওয়ায় দিন দিন গ্রিন টির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরপর আছে আদি চা, যা অর্থডক্স চা নামে পরিচিত। চায়ের পাতাকে হাতে মলে এই চা তৈরির শুরু। এরপর আছে সীমিত পর্যায়ের হোয়াইট চা, ইয়েলো চা ও ওলং চা।
চা পরামর্শক ও জ্যেষ্ঠ চা–কর মোহাম্মদ শাহ্জাহান আকন্দ গত মঙ্গলবার বলেন, চায়ের উৎপাদন বাড়ছে। এটা ভালো দিক। কিন্তু পাশাপাশি চায়ের গুণগত মানও রক্ষা করতে হবে। গুণগত মান বজায় থাকলেই চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি টেকসই হবে। এ ক্ষেত্রে চা-শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অন্য দেশেও দক্ষ, আধা দক্ষ, অদক্ষ ক্যাটাগরির শ্রমিক আছে। সবাইকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা দরকার। মানসম্মত চা উৎপাদন হলে, চায়ের প্রকৃত মূল্য পেলেই তবে চা-শিল্প স্থায়িত্ব পাবে। ওই চা-কর বলেন, ‘চা-কে আমাদের জাতীয় পানীয় হিসেবে ঘোষণা দরকার।’
বাংলাদেশ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চা এমন একটা শিল্প, রাতারাতি কিছু সম্ভব নয়। প্ল্যান, ইমপ্লিমেন্ট ও বাজারজাত করতে হয়। সেটা ঠিকমতো করা গেলে দুই-তিন বছর পরে রেজাল্ট পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে একটা মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছি। ২০২৫ সালের মধ্যে আমরা আশা করছি ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করব। সে ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ মিলিয়ন কেজি চা বিদেশে রপ্তানি করতে পারব।’